নিজেকে ভালোবাসুন
নিজের শরীরকে ভালোবাসুন। অপ্রয়োজনীয় নীরবতা ভেঙে সচেতনতা গড়ে তুলুন, নিজের জন্য এবং প্রিয়জনদের জন্য। নিজে জানুন, অন্যদের জানতে
সাহায্য করুন
আকলিমা জান্নাত
নারীদের নীরব ঘাতক বলা হয় স্তন ক্যানসারকে। ক্যানসারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে সারা বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে এবং নারীদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে শীর্ষে আছে এই ক্যানসার। স্তন ক্যানসারকে মরণব্যাধি বা ঘাতকব্যাধি বললেও ভুল বলা হবে না। স্তন ক্যানসার বিষয়ে সচেতন করা, সময় থাকতে প্রতিরোধ এবং যথাযথ চিকিত্সা গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর অক্টোবর মাসকে স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। একইভাবে পালন করা হচ্ছে এ বছরও। পৃথিবীর ঘাতক ব্যাধিগুলোর মধ্যে স্তন ক্যানসার বেশি মারাত্মক। ক্যানসারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফুসফুসের ক্যানসারের পরই স্তন ক্যানসারের অবস্থান। ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ডের ব্রেস্ট ক্যানসার স্ট্যাটিসটিকস শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে ২ মিলিয়নেরও বেশি স্তন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয় এবং বিশ্বব্যাপী নারীদের ক্যানসারের শীর্ষে আছে স্তন ক্যানসার। আইএআরসি (ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার) গ্লোবোক্যান, ২০০৮-এর তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর নতুন করে ১.৩৮ মিলিয়ন নারী এই ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৪ লাখ ৫৮ হাজার রোগী মারা যাচ্ছে। এই রোগে মারা যাওয়ার হার আমাদের দেশের মতো মধ্যম আয়ের এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেই অনেক বেশি, যা বিগত কয়েক বছরে বেড়ে গেছে অনেক গুণ। কারণ এসব দেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ সনাক্ত করার বিষয়ে সচেতন থাকে না এবং সনাক্ত করার পর উপযুক্ত চিকিত্সা নিতে পারে না। এখনো কেন যেন এই রোগটাকে অনেকে গোপন রোগ হিসেবে দেখেন এবং এখানে এটি একটি সামাজিক ট্যাবুর রূপ নিয়েছে। এমনকি বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতেও আগ্রহী নন অনেকে।
স্তন ক্যানসার হওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। কিন্তু সময় থাকতে শনাক্ত করতে পারলে, যথাযথ ডায়াগনোসিস ও চিকিত্সার মাধ্যমে এর হাত থেকে বাঁচার খুব ভালো একটা সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ক্যানসার শনাক্ত করতে দেরি হয়ে গেলে, তখন মৃত্যুর প্রহর গোনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আমাদের দেশের নারীদের সচেতনতার অভাবে অনেকের একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ছে স্তন ক্যানসার। যখন প্রাণঘাতী এই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস বা ইচ্ছাশক্তি কোনোটাই অবশিষ্ট থাকে না।
স্তন ক্যানসারকে নারীদের নীরব ঘাতক বলা হলেও নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে এই রোগ। তবে নারীদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি। নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। সাধারণত চল্লিশোর্ধ নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাও অনেক বেড়ে যায়।
স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হলো স্তনের বিভিন্ন অংশে ‘লাম্প’, অর্থাত্ দলা বা চাকা অনুভূত হওয়া, স্তনের স্বাভাবিক আকারে পরিবর্তন আসা। অনেক সময় স্তনের বৃন্ত থেকে তরল পদার্থ বা রক্ত বের হতে দেখা যায়। ত্বক খসখসে হয়ে চামড়া ওঠা। অনেক ক্ষেত্রে বগলের নিচে গুটি অনুভূত হতে পারে। এ লক্ষণগুলো দেখা গেলে বিলম্ব না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে।
নারীদের স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতন করার জন্যই প্রতি বছর পুরো বিশ্বব্যাপী অক্টোবর মাসকে স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। প্রতি ৬ মিনিটে একজন নারী যে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং যার অর্ধেকই মারা যাচ্ছে, সেই রোগটাকে কোনো বিবেচনায় লজ্জার কিংবা গোপন রোগ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এটা আপনার জীবনের প্রশ্ন। এই রোগ প্রতিরোধে নারীদের মধ্যেই সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। তবে নারী-পুরুষ সবার সচেতনতাই পারে প্রাণঘাতী এই ক্যানসারকে প্রতিরোধ করতে। যে কথাটা বলতেই হয়, নিজেকে ভালোবাসুন-নিজের শরীরকে ভালোবাসুন। অপ্রয়োজনীয় নীরবতা ভেঙে সচেতনতা গড়ে তুলুন, নিজের জন্য এবং প্রিয়জনদের জন্য। নিজে জানুন, অন্যদের জানতে সাহায্য করুন।
