রিকশাচালক শাকুর স্বপ্ন দেখছেন বিসিএসের

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:১৯

>> সাইফুল ইসলাম

 

জীবন যুদ্ধের একজন লড়াকু সৈনিক আব্দুস শাকুর। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্ন আত্মবিশ্বাস থাকলে সহজেই  সফলতার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানো যায়। শাকুর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে সদ্য মাস্টার্স শেষ করেছেন। হয়েছেন প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয়। অথচ জীবনের প্রয়োজনে একসময় রিকশা চালাতেন।

শাকুরের জন্ম পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার আন্দুয়া গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি।

জন্মের কয়েক বছর পর হারিয়েছেন মাকে। এর পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে চরম দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের কারণে ছোটবেলাতেই রিকশা চালানো শুরু করেন শাকুর। তিনি বলেন, ‘যখন আমি রিকশা চালানো শুরু করি, তখন প্যাডেলে ঠিকমতো পা লাগাতে পারতাম না। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। কারণ, রিকশা চালিয়েই আমাকে চলতে হবে। অন্য কোনো পথ ছিল না আমার। একটানা দু বছর ভাড়ায় রিকশা চালাই। তখন আমার জীবন থেকে ষষ্ট ও সপ্তম শ্রেণি হারিয়ে যায়।’

রিকশা চালানোর সময় পরিচয় হয় মোহাম্মদ নূর হোসেন মাওলানার সঙ্গে। শাকুর সবসময় মাওলানাকে মাহফিলে আনা-নেওয়া করতেন। এর কিছুদিন পর তার এই জীবন সংগ্রামের কথা শোনেন এবং লেখাপড়ার প্রতি শাকুরের ভালোবাসা দেখতে পান মাওলানা। তখন তিনি তাকে ভর্তি করিয়ে দেন তার মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে। সেই সঙ্গে মাদ্রাসার এতিম খানায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’

এরপর শাকুরের পরিচয় হয় মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। মনির তার মতোই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। সে থাকত মাদ্রাসার পাশে থাকা ইউনিয়ন পরিষদের একটা রুমে। মনির তখন অনার্সে পড়তেন। মনিরের কাছ থেকে তার যে যে বিষয়ে সমস্যা হতো, সেগুলো বুঝে নিতেন। মনিরই তাকে পড়াশোনার বিষয়ে উত্সাহ দিতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

তিনি সালেহিয়া ফাযিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে ভর্তি হন সুবিদখালী সরকারি কলেজে। সেখান থেকে ৪.৮০ পেয়ে এইচএসসি শেষ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা আসেন শাকুর। ঢাকা আসাটা তার জন্য সহজ ছিল না। বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ভর্তি হন কোচিংয়ে।  এলাকার অনেকই বলতেন, ‘এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই।  কাজ শুরু করে দাও।’ কিন্তু শাকুর তাদের কথা নীরবে শুনে গেছেন।

তার কষ্ট বৃথা যায়নি। চান্স পেয়ে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। চান্স পেয়েও ভর্তি নিয়ে ছিল সংশয়। ভর্তি হতে লাগবে ১২ হাজর টাকা। এত টাকা কোথায় পাবেন। পরে এই টাকা আসে তাদের শেষ সম্বল চাষের জমি  বিক্রি করে। বিশ্ববিদ্যালয়েও করেছেন ভালো রেজাল্ট। অনার্সে তিনি পেয়েছেন সিজিপিএ ৩.৬৪ এবং মাস্টার্সে ৩.৭৫ পেয়ে হয়েছেন বিভাগের দ্বিতীয়। তিনি জানান, সবশেষ টাকার জন্য থিসিসটা না করেই তাকে মাস্টার্স শেষ করতে হয়েছে। কেননা থিসিস করতে গেলে এতে ১০ হাজারের মতো টাকা লাগে। যেটা তিনি আর সংগ্রহ করতে পারেননি।

তিনি স্বপ্ন দেখেন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। ছোটবেলা থেকে লালিত এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ইচ্ছাশক্তি থাকলেই পড়াশোনা করা যায়। শাকুর নিজেই তার উদাহরণ। কারণ দু বছর রিকশা চালিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।