শুদ্ধি অভিযান শুরু হোক ঘরে ঘরে

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৫৭

সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি মারাত্মক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে না পারলে জাতি হিসেবে আমরা সব সুনাম ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় যে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান, তার পথে একটি বড়ো অন্তরায় সর্বব্যাপী দুর্নীতি। শেখ হাসিনা স্বপ্ন দেখেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। যেহেতু তিনি নিজে কাজ করেন, সেহেতু কাজের পথে কোথায়, কীভাবে বাধা আসে সেটাও তিনি জানেন। বাধা উত্তরণের পথও তিনি খোঁজেন এবং বের করেন। তিনি সাহসী ও দূরদর্শী। দীর্ঘ সময় সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তার অভিজ্ঞতার ভান্ডারও পূর্ণ হয়েছে। তার সময়কালে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বাংলাদেশকে কেউ এখন উপেক্ষা করতে পারে না, বরং সমীহ করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ আর কারো কাছে করুণা ভিক্ষা করে না। কোনো বিশ্বশক্তি মোড়লগিরি দেখাতে পারে না, চোখ রাঙাতে পারে না। বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে পদ্মা সেতু নির্মাণের পথে হেঁটে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সক্ষমতার বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়ে সামাজিক সূচকে ধাপের পর ধাপ ওপরে উঠে যখন বিশ্বসেরা অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে, তখন এসব অর্জন চেটেপুটে খাওয়ার বেপরোয়া লোভ পেয়ে বসেছে কিছুসংখ্যক দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্তকে। তারা যেখানে টাকা দেখছে, সেখানেই থাবা মারছে। নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সম্পদ কুক্ষিগত করছে। বিদেশে পাচার করছে বিপুল অঙ্কের টাকা। লুটেরা ধনিকেরা শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মাধ্যমে একদিকে অসংখ্য মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত থেকেও মোটা টাকা ঋণ নিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে উদ্যত হয়েছে। পরের টাকায় পোদ্দারি করা দুর্বৃত্তদের লাগাম টেনে ধরার তাগিদ দেশের বিবেকবান মানুষ যখন প্রবলভাবে উপলব্ধি করছিল, ঠিক তখনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি মানুষের নেতা, মানুষের মনের কথা তিনি ঠিকই পড়তে পারেন।

দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকায় দলের পরিচয় ভাঙিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যারা অল্প সময়ে মোটা টাকার মালিক হয়েছেন, যারা একেকজন ‘সম্রাট’ হয়ে উঠেছিলেন, যারা মানুষের কাছে ভয়াবহ আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছিলেন, যাদের আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে ভাবা হচ্ছিল, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। তাদের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেই প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যত বড়ো শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর হোন না কেন, অভিযান থেকে কেউ রেহাই পাবেন না। দলের হোক আর বাইরের হোক, দুর্নীতি করে কেউ রেহাই পাবেন না।’ প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় মনোভাব দেশের মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। বিশেষ করে নিজের দলের মধ্য থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ায় মানুষের আস্থা বেড়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে শুরুতে যারা ‘আইওয়াশ’ ভেবেছিলেন, তারাও এখন নড়েচড়ে বসছেন। সরকারি দলের কিংবা সহযোগী সংগঠনের নাম-পদবি ব্যবহার করে এতদিন যারা দৌরাত্ম্য দেখিয়েছেন, তারা এখন লেজ গুঁটিয়ে আত্মরক্ষার কৌশল খুঁজছেন।

আওয়ামী লীগের সম্মেলন ডিসেম্বর মাসে। তার আগেই যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হবে। সম্মেলনে এই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যেই ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন মুখ আনা হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বেশি ঝড়ের কবলে পড়েছে যুবলীগ। যুবলীগের যারা গ্রেফতার হয়েছেন, তারা সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত। সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যারা বিতর্কিত, যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চলমান আছে, যাদের নামে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তারা কেউ দলে থাকতে পারবেন না। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির লোক ও ভালো মানুষ সংগঠন করবেন।’

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহের ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব নির্বাচনে যদি প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা পালিত হয়, যদি স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ভালো মানুষেরা নেতৃত্বে আসেন, তাহলে মানুষ তাদের স্বাগত জানাবে। ক্লিন ইমেজের মানুষের হাতে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ না থাকলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও সফল হবে না। যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগঠনের নেতাদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। তিনি বলেছেন, অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন ও দুর্নীতি করায় বিএনপি-জামায়াত সরকারের পতন হয়েছে। এভাবে অনৈতিক অর্থ উপার্জন করলে তাদের সঙ্গে পার্থক্য থাকল কোথায়? তাহলে তো মানুষের আস্থা থাকবে না। তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত যারাই অবৈধভাবে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তাদের ধরা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, গত প্রায় ১০ বছরে অনেক অর্জন হয়েছে। দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। কারো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কারণে এ অর্জন নষ্ট হতে দেবেন না তিনি। এ জন্য ঘর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তার সরকার যেন বিএনপি-জামায়াতের সরকারের মতো না হয়, তার সরকারকে যাতে মানুষ আলাদাভাবে চিনতে পারে, এটা তিনি নিশ্চিত করতে চান। এটা খুব স্বাভাবিক প্রত্যাশা। যেসব কারণে মানুষ বিএনপি-জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে, আওয়ামী লীগের আমলে তার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি-জামায়াতের সময় থেকে বর্তমান সময়কে আলাদা করতে পারে না। ব্যতিক্রম শুধু প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে। শেখ হাসিনা তুলনাহীন। তিনি সবাইকে অতিক্রম করেছেন। তাকে অতিক্রমের সক্ষমতা কারো আছে বলে মনে হয় না। তবে তার একক অর্জনের ওপর নির্ভরশীলতা আওয়ামী লীগের মতো পুরোনো, ঐতিহ্যবাহী, পোড় খাওয়া দলের কাছে প্রত্যাশিত নয়। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো শেখ হাসিনার সঙ্গে পায়ে পায়ে চলার মতো সক্ষম হয়ে উঠুক—এটাই দেশের মানুষ দেখতে চায়।

প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা করলে মানুষ খুশি হবে। অন্য শাসনামলের খারাপ দৃষ্টান্ত সামনে এনে এখনকার খারাপকে জাস্টিফাই করতে চাইলে মানুষ তা ভালোভাবে নেয় না। ওরা খারাপ করেছিল বলেই তো আপনাদের বেছে নেওয়া হয়েছে। ওরা অধম, তাই বলে আপনারা কেন উত্তম হবেন না?

সরকার ও আওয়ামী লীগ শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। এই শুদ্ধি অভিযানের সাফল্য কামনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা চাইব, আমাদের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোতেও শুদ্ধি অভিযান শুরু হোক। প্রায় সব রাজনৈতিক দলে, বিশেষ করে অতীতে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, কাউকে কাউকে নিয়ে বিতর্কও আছে। রাজনীতিতে একটি নতুন সময় তৈরির তাগিদ যদি সবার মধ্যে থাকে, তাহলে কেন সবাই নিজ নিজ ঘরে শুদ্ধি অভিযান চালাবেন না? যারা ক্ষমতায় থাকে, ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা কি কেবল তাদেরই করতে হবে? যারা ক্ষমতাপ্রত্যাশী, তাদের কি নিজেদের স্বচ্ছতা মানুষের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন নেই?

শুদ্ধি অভিযান তো আমাদের পরিবারগুলোর মধ্যেও শুরু হওয়া দরকার। আয়ের চেয়ে যারা ব্যয় বেশি করেন, অনৈতিকভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যারা বিলাসী জীবন যাপন করেন, তাদের তো প্রথম নিজ নিজ পরিবারের কাছেই জবাবদিহি করা উচিত। পরিবারের কাছে নিজের সম্পর্কে তথ্য গোপন করে কেউ কি পার পেতে পারে? অথচ আমাদের দেশে দেখা যায়, আত্মীয়-পরিজনকে আড়াল করেই একেকজন ভয়াবহ দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠেন। আমরা সবাই যদি সত্ থাকার চেষ্টা করি, আমরা যদি নিজের পাতে ঝোল টানার প্রবণতা থেকে বের হতে না পারি, তাহলে শুদ্ধি অভিযানও একসময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে সাফল্য আসবে সম্মিলিত উদ্যোগ ও চেষ্টায়।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক