দীপ্তিময়ী দীপ্তি

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৪৫

বিভূতিভূষণ গুপ্ত মানুষটা গানপাগল। এ কথা সবাই জানে। বাগেরহাটের রামপালের পাড়দীঘির পাশের মাঠে ফি বছর একটা অনুষ্ঠান হয়। আয়োজকদের তরফ থেকে মুরব্বি গোছের কেউ একজন খবর পাঠায়, ‘ও বিভূতি, এইবারও তো তোমারে কিন্তু গান গাতি হবি।’ অন্য শিল্পীদের মতো বিভূতি বাবু হাজারটা বায়নাক্কা করেন না। গানের আমন্ত্রণ পেলে নিজের হারমোনিয়ামটা কোলে করে নিয়ে যান। কিন্তু এবার শুধু হারমোনিয়ামটা নিলেন না, সঙ্গে নিলেন নিজের চার বছরের ভাগ্নি দীপ্তিকে। মেয়েটাকে কিছুদিন ধরে তিনিই গান শেখাচ্ছেন। এই চার বছরের বালিকার মধ্যে কী বিস্ময় লুকিয়ে আছে, সেটাই এবার সবাইকে দেখিয়ে দিতে চান।

মঞ্চে মামা-ভাগ্নিকে ওঠানো হলো। এত বড় হারমোনিয়ামের আড়ালে মেয়েটাকে যে দেখাই যায় না। কেউ একজন একটা টুলও জোগাড় করে এনে দিল। তাতে দাঁড়িয়ে মেয়েটা গাইল, ‘আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি, নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।’ এই যে শুরু হলো গান, সেটাই দীপ্তির জীবন বদলে দিল। যে গানটা একসময় হারিয়েও যেতে বসেছিল। ফিনিক্স পাখির মতো নিজের শিল্পীসত্তার পুনর্জন্ম ঘটানো দীপ্তি এবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সিলন সুপার সিঙ্গারে। এই বদলে যাওয়ার পেছনে আছে সিলন সুপার সিঙ্গার। একসময় নিয়মিত গান করতেন, কিন্তু সংসারের চাপে আর সব চাওয়ার সঙ্গে গানটাকেও বিসর্জন দিয়েছিলেন যে গৃহিণীরা; তাদের নতুন করে গানে ফিরিয়ে আনার মঞ্চ এটি। বাংলাদেশে গৃহিণীদের নিয়ে আয়োজিত গানের প্রথম রিয়ালিটি শো।

স্বামী প্রতাপ সরকার আইনজীবী। রোজ খুলনার কোর্টকাচারি যাওয়া-আসার পথে শিববাড়ির মোড়ে একটা বড় বিলবোর্ড চোখে পড়ে। কী একটা রিয়ালিটি শো হবে। প্রতাপ স্ত্রীকে নানাভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেন অডিশন দিতে। কিন্তু দীপ্তির মনে দ্বিধা। ছোটবেলায় অনেক প্রতিযোগিতাতেই নাম দিয়েছেন। কিন্তু কখনোই বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েই যাওয়া হয়নি। স্বামীর পীড়াপীড়ি তো ছিলই, তা ছাড়া খুলনায় অডিশনের ভেন্যু ছিল বাড়ির একদম কাছেই। দীপ্তি ভাবলেন, আচ্ছা, গিয়ে অডিশনটা দিয়েই আসি। অডিশন দিতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। প্রায় সাতশ জন এসেছে অডিশন দিতে! দীপ্তির ভয়টা আরো বাড়ল। প্রাথমিক অডিশনে সাবিনা ইয়াসমিনের একটা গান গাইলেন। বিচারকেরা প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করেও ফেলল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এবার হাজির হতে হবে মূল তিন বিচারক—ফাহমিদা নবী, পার্থ বড়ুয়া ও তারিন জাহানের সামনে। নামগুলো শুনলেই তো ভয় লাগে। এতদিন এই তারকাদের টিভিতেই দেখে এসেছেন। সামনাসামনি প্রথম দেখা, সেটিও আবার গান শোনানো জন্য! দীপ্তি নিজেকে আরো কঠিন পরীক্ষাতেই ফেললেন ইচ্ছে করে। মাহমুদুন্নবীর একটি কঠিন গানই বেছে নিলেন। আর সেই গান যেন স্মৃতিকাতর করে তুলল ফাহমিদা নবীকে। দারুণ প্রশংসা করলেন পার্থ বড়ুয়া আর তারিন জাহানও। পেয়ে গেলেন ঢাকার স্টুডিও রাউন্ডের টিকিট—ইয়েস কার্ড!

একের পর একে রাউন্ড পেরিয়ে যেতে লাগলেন দীপ্তি। জনপ্রিয় শিল্পী নাজমা জামানের ‘তোমারই জীবনে’ গানটি গেয়ে তো তাক লাগিয়ে দিলেন। গান শেষে তিনজন বিচারক একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। দীপ্তির আত্মবিশ্বাস উঠে গেল তুঙ্গে। কিন্তু সেটাই হোঁচট খেল দেশের গানের রাউন্ডে এসে। দীপ্তি প্রায় বাদই পড়ে যেতে বসলেন। দীপ্তির মিলে গেল লাইফ লাইন। না, শেষ পর্যন্ত সেরা পাঁচে উঠল তারই নাম। কিন্তু দীপ্তি তখনো ভাবেননি, তিনি চ্যাম্পিয়ন হবেন। বাকি চারজন প্রত্যেকে এত ভালো গান করেন, পাঁচের একজন হয়ে থাকতে পেরেই তিনি খুশি। এমনকি চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পর যখন তারই নাম বললেন উপস্থাপিকা, দীপ্তির তখনো মনে হচ্ছে, কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে না তো!

রুনা লায়লার মতো কিংবদন্তি তাকে চ্যাম্পিয়ন লেখা শ্যাশে পরিয়ে দিলেন। এসময় স্বামীর কথা মনে পড়ল; কত সহযোগিতা-সমর্থনই না দিয়েছেন! তারপর সব থিতিয়ে এলে দীপ্তির খুব মনে পড়ল মামার কথা। আহা, মামা আসতে চেয়েছিলেন, অসুস্থতার জন্য আসতে পারেননি। দীপ্তির তখন মন টানছেআবার গাইতে গান ‘আয় তবে সহচরী’। সেই গানের একপর্যায়ে যখন দীপ্তি দরদ ঢেলে গাইবেন, ‘ঢালো ঢালো শশধর, ঢালো ঢালো জোছনা’; তখন সত্যিকারের জ্যোত্স্না নেমে আসবে তাদের উঠোনজুড়ে!