কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তকাল। শরেক বিদায় দিয়ে হেমন্ত এসে উঁকি দেয় বাংলার পথে প্রান্তরে। সকালে হালকা কুয়াশা আর শীত শীত আবেশ জানিয়ে দেয় শীত আসছে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ধানগাছে জমে থাকা শিশিরফোঁটারা ঝলমল করে ওঠে। হেমন্তের সকালে আবছা কুয়াশায় ঢাকা থাকে মাঠঘাট। ঝকঝকে সুনীল আকাশে গাছের কচি কচি পাতার ফাঁক থেকে উঁকি দেয় রোদ। সুফিয়া কামালের ‘হেমন্ত’ কবিতায় আছে—
সবুজ পাতার খামের ভেতর; হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন পাথরের ওপার থেকে আনলে ডেকে হেমন্তকে।
দুপুরবেলা ভীষণ অলস সময় কাটে। শীত-গরমের মাঝামাঝি সময় হওয়ায় কখনো গরম আবার কখনো ঠান্ডা লাগে। দুপুরবেলা হালকা গরমে শরীর থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম বের হলে ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভূত হয়। শীত-গরমের এই সময়ে কমবেশি সবাই একটু-আধটু রোগে ভোগে।
আর্দ্র বাতাসে নামে সন্ধ্যা, গোধুলি আলোয় আকাশটা হয়ে যায় টকটকে লাল। সেই লাল আলো আর সবুজ মিলেমিশে একাকার হয়ে ভিন্ন এক আবহ সৃষ্টি করে। হেমন্তের রাতে মেঘমুক্ত আকাশে ঝলমলে চাঁদটা হাসে চারদিকে আলো ছড়িয়ে। হাসনাহেনার গন্ধে ম ম করে চারপাশ। গভীর রাতে গ্রামের বাড়ির উঠোনে কুকুর ডাকে। চারদিকে ছমছমে পরিবেশ। টিনের চালে শিশিরফোঁটার টুপটাপ আওয়াজ যেন অন্য কোনো ঘোর সৃষ্টি করে।
কৃষকরা এই সময়ে তাদের ব্যস্ত সময় পার করে। বর্ষার শেষে বোনা আমন ও আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। হেমন্তে ধান হয় পরিপক্ব। নতুন ফসল ঘরে ওঠে। গ্রামের উঠোন জুড়ে শুরু হয় ধান মাড়াইয়ের কাজ| হেমন্ত মানেই নবান্ন। নবান্ন অর্থাত্ নতুন অন্ন| নতুন চালের রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজিত উত্সব। নবান্ন উপলক্ষ্যে বানানো হয় হরেক রকমের পিঠা। বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্নের উত্সব| ঘরদোর পিঠার ঘ্রাণে ম ম করে। দিনভর নানা আয়োজন| রাত হলে পালাগানে সবাই মেতে ওঠে।
গাছিরা ধারালো ‘দা’ দিয়ে খেজুরগাছ কেটে রস সংগ্রহ করে। সেই খেজুরের রস দিয়ে বানানো হয় সিন্নি। সকাল হলে গায়ে কুয়াশা মেখে গরম গরম সিন্নি খেতে কী যে ভালো লাগে। হেমন্তের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয় খেজুরের গুড় বানানোর উত্সব। গায়ের উঠোন জুড়ে বড়ো বড়ো উনুন তৈরি করা হয়। সেই উনুনের ওপর তাপাল রেখে খেজুরের রস জ্বাল দেওয়া হয়। জ্বাল দেওয়ার পরে খেজুরের রস ঘন হয়ে গুড়ে পরিণত হয়|
নতুন চালের গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে সকালবেলা নানা রকমের ভর্তা আর আচারের তেল দিয়ে রোদে বসে ভাত খাওয়া। সঙ্গে থাকে যদি টাটকা দেশি মাছের ঝোল! এ সময়ে ভাপা পিঠা এবং চিতাই পিঠাই বেশি বানানো হয়| তবে গোটা হেমন্ত জুড়েই চলতে থাকে হরেক রকমের পিঠার মহোত্সব|
