বড়পীর গওসুল আজম সৈয়দ আবদুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হির ওফাত দিবস পালিত হয় ফাতিহায়ে ইয়াজদহম নামে। ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দ মুতাবিক ৫৬১ হিজরীর ১১ রবিউস সানী সোমবার তিনি শেষ প্রহরে বাগদাদ শরীফে নিজ হুজরাখানায় ইন্তেকাল করেন। গওসুল আজম (রহ) ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ মুতাবিক ৪৭০ হিজরীর ১ রমজান, সাহরীর ওয়াক্তে পারস্যের কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ উপকূলে জিলান বা গীলান নগরীর নায়ফ মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আব্বা হুজুর সৈয়দ আবু সালেহ ছিলেন ইমাম হাসানের বংশধর এবং আম্মা সৈয়েদা উম্মুল খায়ের ফাতিমা ছিলেন ইমাম হুসাইন বংশীয়। তিনি মাতৃগর্ভ থেকে ১৮ পারা কুরআনের হাফেজ হয়েছিলেন। জিলানে লেখাপড়া শেষ করে মায়ের নির্দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য একটি কাফেলার সাথে বাগদাদ শরীফে আসেন। তাঁর আম্মা তাঁর আস্তিনের বগলে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা তাঁর লেখাপড়ার খরচের জন্য সেলাই করে দেন এবং পুত্রকে বলেন, বাবা উস্তাদদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখবে, কখনও মিথ্যা কথা বলো না। পথিমধ্যে ঐ কাফেলা ডাকাত দ্বারা আক্রান্ত হয়। ডাকাতরা কাফেলার সবার ধন সম্পদ লুট করে নেয় এবং বালক আবদুল কাদের (রহ)কে জিজ্ঞেস করে, খোকা তোমার কাছে কী কিছু আছে? তখন তিনি অকপটে বলেন, আমার আস্তিনের বগলে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে। ডাকাতদল বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় এবং জিজ্ঞেস করে, খোকা তুমি যদি না বলতে তাহলে আমরা তো জানতে পারতাম না তোমার কাছে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে। তখন গাউছুল আজম বললেন, আমার আম্মা আমাকে বলেছেন, বাবা সদা সত্য কথা বলবে। একথা শুনে ডাকাত সর্দারের মধ্যে আত্মগ্লানির উদ্বেগ হয় এবং গাউসুল আজমের হাতে হাত রেখে তওবা করে। গাউসুল আজম বাগদাদ শরীফে নিজামিয়া মাদ্রাসায় স্বনামধন্য ওস্তাদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করে যুগশ্রেষ্ঠ আলিমে পরিণত হন। তারপর ইলমে তাছওয়াফ অর্জনের জন্য নিমগ্ন হন। একদিন তিনি দজলা নদীর তীর ধরে জুম্মার মসজিদে যাবার পথে দেখলেন, একজন জীর্ণশীর্ণ লোক প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় শুয়ে আছেন। ঐ ব্যক্তি তাকে দেখে বললেন, বাবা, আমাকে তুলে ধর। গওসুল আজম তাকে ধরে তোলার সাথে সাথে ঐ ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে একজন টগবগে যুবকে পরিণত হলো এবং গওসুল আজমকে বললেন, আমি দীন ইসলাম, কালের জঞ্জালে আমি মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছিলাম, তোমার পরশে আমি জিন্দা হয়ে উঠেছি। তুমি মহীউদ্দীন অর্থাত্ দীনকে জীবিতকারী। তখন থেকেই গউসুল আজমের লকব হয়ে যায় মহীউদ্দীন। তাঁর দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে প্রবিষ্ট যাবতীয় শিরক বেদআত কুফর ও কুসংসার দূরীভূত হয়। অচিরেই তিনি মহান সংস্কারক হিসেবে মশহুর হন। তিনি এলমে তাছওয়াফের যে তরিকা বিন্নাস করেন তা কাদেরিয়া তরিকা নামে খ্যাত। বাংলাদেশে এই তরিকা নিয়ে আসেন হজরত শাহ্জালাল (রহ)। বাংলাদেশের কাদেরিয়া তরিকার বহু খানকা হয়েছে। গাউসুল আজম (রহ) এর অনেকগুলো কেতাব রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—ফতোহুল গায়ব, ফতোহুল রাব্বানী ছিররুল আসরার, গুণিয়াতুল তালেবীন, কাসেদিয়া এ গওসিয়া প্রভৃতি। বাংলাদেশে কাদেরিয়া তরিকার ওপরে বহু গ্রন্থ লিখিত হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খড়কির পীর, শাহ্ আবদুল করিমের এরশাদে খালেকিয়া, খড়কির মওলানা শাহ আবু নঈম রচিত ‘হেলালে মারেফত’ সুফী সদরুদ্দিন রচিত কাদেরিয়া তরিকা ও হাসান আবদুল কাইয়ূম রচিত তালিমে তাশাউফ প্রভৃতি। গউসুল আজম এর ওফাত দিবস ফাতিহা ইয়াজদহম বা ১১ তারিখের ফাতিহা উদযাপনের মধ্য দিয়ে তার ফয়েজ ও তাওরজুহ হাসিল হয়।
lলেখক:পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহম্মদ (স), সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
