টুইট-প্রেমিক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অক্টোবর মাসের ৯ তারিখের টুইটটি ছিল চমকপ্রদ। সেই টুইটে তিনি ওয়াশিংটনের বৈদেশিক নীতির মুখোশ খুলে ফেলেন, বলেন যে—উদ্ভট সব দোহাই দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যেসব যুদ্ধ শুরু করেছে, সেগুলো বাবদ যুক্তরাষ্ট্রের আট ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা গেছে। ...কাজেই সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী সরে আসছে, ‘রেড লাইনে’ বর্ণিত শর্ত অনুযায়ী তুর্কি বাহিনীর আগমন হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, ট্রাম্পের টুইটে ওয়াশিংটনের অনেকেই খুশি হয়নি মোটেই। হওয়ার কথাও নয়।
আন্তর্জাতিক সমাজ নামক গোষ্ঠী সমস্বরে কুর্দিস্তানে তুর্কিদের সামরিক হামলা এবং তুর্কি সেনাদের তাড়া খাওয়া শ’য়ে শ’য়ে হাজারে হাজারে পলায়নরত কুর্দিদের যে চিত্র উপস্থাপন করেছে—সেসব দেখে-শুনে চমত্কৃত হতে হয়। ব্যবস্থাটির বিরুদ্ধে কেউ কিন্তু সরাসরি প্রতিবাদ করছে না। কারণ তারা জানে যে, ফ্রান্স তো বটেই বাকিরাও সিরিয়াতে যে র্নিমম অপ্রতিরোধ্য অবস্থার সৃষ্টি করেছে এবং তাদের খুশি রাখতে কুর্দি যোদ্ধারা এবং অসামরিক জনগোষ্ঠী মানবাধিকারের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ করেছে—এমন এক প্রেক্ষাপটে পাইকারি হারে আরেকটি ‘ম্যাসাকর’ ছাড়া পুনরায় শান্তি ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব?
সব যুদ্ধই, যখন শেষ পর্েব উপনীত হয়, প্রত্যেকেই, ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কৃত-অপরাধগুলো সযত্নে মুছে ফেলতে তত্পর হয়। প্রয়োজন হলে ঝামেলাপূর্ণ মিত্রকে ভুলে যেতেও পেছপা হয় না। অতঃপর তাদের সৃষ্ট অতীত অধ্যায়ে আমরা তাদের সদাচারপূর্ণ সুন্দর চমত্কার ভূমিকায় দেখি, পড়ি...। সিরিয়ার সীমান্তে তুর্কি বাহিনীর ‘অপারেশন পীস স্প্রি’-কে কেন্দ্র করে আমরা ‘আর্ন্তজাতিক সমাজের’ সে-ই প্রতিক্রিয়াই প্রত্যক্ষ করছি। এরা কেউই যে সত্য বলছে না, সেটি আমরা জানি। এখন, এদের মধ্যে কে কী লুকোচ্ছে আর সুবিধা মতো কী কী গ্রহণ ও বর্জন করছে, জানলে কেমন হয়!
ইউরোপের মিডিয়া/গণমাধ্যমকে যদি বিশ্বাস করতে হয় তো বলতে হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র কাপুরুষের মতো দায় থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বটে, কিন্তু একমাত্র বিচক্ষণ ইউরোপীয়ানরা দুষ্ট তুর্কিদের কুর্দি-সংহার থেকে কুর্দিদের রক্ষার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো যে, এদের কেউই তা করছে না। আমরা জানি যে এই ঘটনার প্রেক্ষাপট ‘সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এবং প্রসঙ্গ : ‘বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য/গ্রেটার মিডল-ইস্ট’। অর্থাত্ ‘বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে’র তথা মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্নিমাণের ক্ষেত্রে সিরিয়া-সংকট একটি পর্যায় মাত্র। ২০০১ সালের সর্বজনবিদিত ‘নাইন ইলেভেন’ ঘটনার অব্যবহিত পরে পেন্টাগন অর্থনৈতিক-পুঁজিবাদের স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করে, সেখানে বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয় : এক ভাগে বিকশিত হবে বিশ্বায়িত আর্থ-ব্যবস্থা, দ্বিতীয় ভাগটি হবে প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামালের উত্স-ভান্ডার। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পৃথিবীর দ্বিতীয়াংশের কোনো কোনো দেশ প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে নিশ্চয়। তাই সে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে তছনছ করে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে মার্িকন সেনাবাহিনী (সূত্র : http://armedforcesjournal.com/blood-borders/)| সেই মতো ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’কে সঙ্গে নিয়ে ‘বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে’র পুনর্নিমাণের কাজ শুরু হয়।
‘দি সিরিয়ান অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি অ্যাক্ট’ নামে ২০০৩ সালে ওয়াশিংটন সিরিয়ার বিরুদ্ধে একটি আইন পাস করে। আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণের পরে তালিকায় সিরিয়া থাকলেও পরিকল্পনার পুনর্বিন্যাস করে ২০১১ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। অতঃপর ২০১১ সালে শুরু হয় আরব বসন্ত। প্রথমে তিউনেসিয়া ও মিসরের পশ্চিমাপন্থী শাসক ক্ষমতাচ্যুত হয়। তারপরে আক্রান্ত হয় লিবিয়া ও সিরিয়া, জালিয়াতি এবং প্রতারণার মাধ্যমে। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক প্রথমে কিন্তু লিবিয়া ও সিরিয়া অপারেশনে অংশ নিতে রাজি হয়নি। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলেন জুপে তখন তুর্কিদের কাছে এক ঢিলে দুই পাখি মারার ট্রিক খেলেন, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেট ডাবুতগলু’কে প্রস্তাব দেন যে লিবিয়া ও সিরিয়া অপারেশনে যদি যোগ দেয় তো তুরস্ককে কুর্দি প্রশ্ন সমাধানে ফ্রান্স সাহায্য করবে : কুর্দিদের জন্য আরেকটি কুর্দিস্তান তুরস্কের ভূখণ্ডে হবে না, হবে আরামাইক ও আরবি ভাষাভাষী অধ্যুষিত সিরিয়ার ভূখণ্ডে। তুরস্ক টোপটি গেলে এবং দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি গোপন প্রটোকল সই করেন। ‘নিজের ভূখণ্ডে স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবে না—এই গ্যারান্টি তুর্কিদের পছন্দ হয়। তদুপরি, ইরাকি কুর্দিস্তানের কুর্দি সরকারের সঙ্গে তুর্কিদের সর্ম্পকও খুবই ভালো। অপরদিকে ১৯১১ সালের আরব জাতীয়তাবাদকে দমন করতে ফ্রান্স কুর্দি গোত্র থেকে রিক্রুটকৃত প্রচুর সদস্য ব্যবহার করেছিল এবং ব্রিটিশরা যেমন ফিলিস্তিনে ইহুদি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত করে, অনুরূপভাবে ফ্রান্সেরও এই অঞ্চলে অবশেষে একটি সফল কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ছিল। ইরাকি কুর্দিস্তানের প্রাণপুরুষ বারজানি গোত্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক অতি নিবিড়, ইসরাইল এই ফ্রাংকো-তুর্কি আঁঁতাতকে সমর্থন দেয় (আনুষ্ঠানিকভাবে বারজানি ছিলেন মোসাদের সদস্য)।
কারা এই কুর্দি? কুর্দিরা যাযাবর জনসমষ্টি (কুর্দিশ শব্দের অর্থও তাই), তারা আধুনিককালের ইউফ্রেটিসের উপত্যকা, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের ভূখণ্ডে ঘুরে বেড়াত। তাদের জীবনপ্রণালী উপজাতিভিত্তিক নয়, গোত্রভিত্তিক, ভাষাগত বিভিন্নতা বিভিন্ন গোত্রকে পৃথক করে রেখেছে। এবং অপরিমেয় সাহসের জন্য তারা সুপরিচিত। উদাহরণস্বরূপ, যেমন : গাজী সালাউদ্দিন বা সালাদিন, ক্রুসেডের তুখোর বীর, সেনাপতি। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ওসমানিয়ারা সেনাবাহিনীর সহায়ক বাহিনী হিসাবে কুর্দিদের রিক্রুট করেছিল। ফলে কুর্দিরা তুরস্কের আনাতোলিয়াতে বসবাস শুরু করে, বাকিরা যাযাবর থেকে যায়। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষের দিকে বহু সংখ্যক আর্মেনিয়ানের হত্যাযজ্ঞে কুর্দি সহায়ক বাহিনী অংশ নিয়েছিল। মহাযুদ্ধের অবসান শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ‘যুদ্ধাবসানের হিসাবনিকাশ’ তালিকার বারো নম্বর পয়েন্টে পরাজিত ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের ধ্বংস্তূপের মধ্যে কুর্দিস্তান সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ‘কিং কেইন কমিশন’ ঘটনাস্থলে দেখে যে কুর্দিরা তখনো আমের্নিয়ান হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে, এবং ভীতসন্ত্রস্ত জীবিতরা পালিয়ে যাওয়াতে এলাকাটি পরিত্যক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ইত্যবসরে মুস্তাফা কামালের নেতৃত্বে ওসমানিয়া সাম্রাজ্যকে বাতিল করা হয় ও তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। উইলসনের কুর্দিস্তান সৃষ্টির জন্য মুস্তাফা কামাল তুর্কি ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেন। ফলে, কোনো কুর্দিস্তান সৃষ্টি হতে পারেনি।
গত এক শতাব্দী ধরে কুর্দিরা তুরস্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করে আসছে। ১৯৮০-এর দশকে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী কুর্দি ‘পিকেকে’ আংকারার বিরুদ্ধে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ শুরু করলে নির্মমভাবে সেটি দমন করা হয়। সেসময়ে অনেকেই উত্তর সিরিয়ায় পালিয়ে যায়, সিরিয়ার সেই সময়কার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদ তাদের
নিরাপদ আশ্রয় দেন। ঠান্ডা-যুদ্ধের অবসানের পরে ‘পিকেকে’ মার্ক্সীয় মতবাদ থেকে সরে আসে, এবং ন্যাটো’র
সেবায় নিয়োজিত হয়। আবেগতাড়িত তুর্কি সদস্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আটলান্টিক মৈত্রীবন্ধন পরিচালিত সন্ত্রাসী
অপারেশনে ‘পিকেকে’ ব্যাপকহারে ব্যবহূত হয়।
১৯৯০-য়ের দশকে, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আর্ন্তজাতিক সমাজ বোমাবর্ষণ করে ইরাককে ছিন্ন ভিন্ন করতে থাকে এবং একই সময়ে তারা সাদ্দামের সুন্নি প্রশাসনের বিরুদ্ধে শিয়া ও কুর্দিদের বিদ্রোহের জন্য উত্সাহিত করে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কল্যাণে দুই লাখ মানুষ নির্বিচারে নিহত হয়, ইরাকের একটি অংশ তারা দখল করে এবং সেখান থেকে ইরাকি সেনাবাহিনীসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দেয়। ২০০৩ সালে এখানে ইরাকি কুর্দিস্তানের সৃষ্টি হয়।
সিরিয়া-যুদ্ধ শুরুর গোড়াতেই প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সিরিয়াতে অবস্থানরত কুর্দি রাজনৈতিক শরণার্থী ও তাদের সন্তানদের সিরিয়ার নাগরিকত্ব প্রদান করেন। তারা সিরিয়ার উত্তরাংশে বিদেশি জিহাদিদের হামলার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশও নেয়। কিন্তু ন্যাটো বৃহত্তর কুর্দিস্তান সৃষ্টির লোভ দেখালে সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দিরা পক্ষ পরিবর্তন করে। পেন্টাগনের প্রজেক্টের মূলমন্ত্র ছিল নৃতাত্ত্বিকতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলকে টুকরো টুকরো করে নানা সাইজের নেশন স্টেট বা রাষ্ট্র সৃষ্টি করা। কিন্তু পেন্টাগনের প্রজেক্টটি ১৯১৯ সালে প্রেসিডেন্ট উইলসনের কুর্দিস্তান সৃষ্টির প্রস্তাবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এবং এমনকি ভাড়াটে সেনাবাহিনী হিসাবে কুর্দিদের পুরস্কৃত করতে ফরাসিরা যে সাইজের কুর্দিস্তান সৃষ্টি করতে চাইছিল, পেন্টাগনের প্ল্যান সেটির চেয়েও বৃহত্তর। এই ব্যবস্থায় ইসরাইল অবশ্য খুশি হয়, কারণ সিরিয়াকে চোখে চোখে রাখা সহজ হবে। পরে অবশ্য পেন্টাগন বৃহত্তর কুর্দিস্তানের সাইজ কমিয়ে ‘বৃহত্তর সুন্নিস্তান’ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
n লেখক : সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
