পাঠ্যপুস্তকে মানবাধিকারের শিক্ষা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৩১

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি বলিয়াছেন যে, পাঠ্যপুস্তকে মানবাধিকার বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। তাহার মতে, ইহাতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানবাধিকার বিষয়ক জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হইবে। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধসম্পন্ন মানবাধিকার সংক্রান্ত মূল্যবোধের সঙ্গে তরুণ সমাজকে প্রাত্যহিক জীবনে অভ্যস্ত করিতে ইহা সহায়তা করিবে। প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমাজে যত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, তাহা ঘটে অন্যের অধিকারের ব্যাপারে যথাযথ সংবেদনশীলতা ও চেতনার অভাবে। শিশুরা বড় হইতে হইতে এই সকল চেতনা ও মূল্যবোধ কতকটা পরিবার হইতে পাইয়া থাকে, কতকটা আত্মীয়-বন্ধু-বান্ধব ও পরিপার্শ্ব হইতে পাইয়া থাকে, আর বাকিটা পাইয়া থাকে বিদ্যালয় ও পাঠ্যপুস্তক হইতে। এমনিতেই পাঠ্যপুস্তকের আধেয় সকল শিক্ষার্থীর আলোকায়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যের প্রতি সহনশীলতা, অন্যের অধিকারের ব্যাপারে সহমর্মিতা ইত্যাদি বোধের ঘাটতি থাকিলে মানুষ নিজের পরিচয়কেই শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া থাকে। সেই হিসাবে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, জাতিগত সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সমাজে প্রাধান্যশীল মানুষ নিজেদের স্বার্থ লইয়াই ব্যস্ত থাকে, অন্যের সুযোগ-সুবিধার দিকে তাহাদের লক্ষ্য থাকে না। এই কারণেই অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জাতিগত সংখ্যালঘু নিপীড়নের শিকার হইয়া থাকে। এইভাবেই ক্ষমতাবান হইয়া আমরা ক্ষমতাহীনদের সম্পদ কাড়িয়া লই। অথবা সেইরূপ যদি নাও করি, আমরা নিজ নিজ স্বার্থে নিমগ্ন থাকি। অপর মানুষেরা মৌলিক অধিকারগুলি ভোগ করিতে পারিতেছে কি না সেইদিকে লক্ষ্য রাখি না। এইভাবে সমাজে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়। আবার আমরা নারী-পুরুষের লৈঙ্গিক পরিচয়কেই একমাত্র পরিচয় হিসাবে মানি, তাই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা সমাজে কী কী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়া যাইতেছে তাহা বুঝিবার চেষ্টাও করি না। সকল ধরনের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করিতে না পারিলে, একটি দেশ অগ্রগামী হইতে পারে না। সকলকে লইয়াই সমাজ। দল-মত নির্বিশেষে সকলের মতপ্রকাশের অধিকারই মানবাধিকার। ইহা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারও। সকল মানুষের মানবাধিকারের বোধের ঘাটতি থাকিবার কারণেই সমাজে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে।

পাঠ্যপুস্তকে মানবাধিকার-সংক্রান্ত আধেয় যথাযথভাবে তুলিয়া ধরিবার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ হইতে পারে। পাঠ্যপুস্তকে ইতোমধ্যে কিছুমাত্রায় মানবাধিকারের আলোচনা রহিয়াছে, কিন্তু ইহার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করিতে হইবে। বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারগুলিকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হইয়াছে। এইসকল অধিকারকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হইয়াছে। ইহার আলোকে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নানান শ্রেণিতে সুপরিকল্পনার মাধ্যমে মানবাধিকারের নানান ইস্যু পর্যায়ক্রমে লিখিত হইতে হইবে। হিন্দু-বৌদ্ধসহ সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘুর নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করিতে, পুরুষের উপর নারীর আধিপত্য কমাইয়া আনিতে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করিতে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মূলধারায় যুক্ত করিতে—সকল মানুষের মধ্যে মানবাধিকারের বোধ জাগ্রত করাইতে হইবে। পাঠ্যপুস্তকে মানবাধিকারের বিষয়গুলি দক্ষতার সহিত যুক্ত করিতে পারিলে শিশু ও তরুণরা সেই আলোকে দীক্ষিত হইবে এবং ধীরে ধীরে সমাজে সকল মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হইবে।