আরশিনগর

বাংলার মমতায় ভারতের আস্থা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৩১

রবিবার ৯ ডিসেম্বর, দক্ষিণ কলকাতার উত্তমমঞ্চে, ‘আইডিয়া অফ বেঙ্গল’ শীর্ষক আলোচনাচক্রে, বাজপেয়ি সরকারের সফল অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিং বলেছেন, একসময় বলা হতো ভারতকে পথ দেখায় বাংলা। আমরা আশায় আছি, আবার সে দেশকে রাস্তা দেখাবে।

যশবন্তের ইশারা পরিষ্কার। তাঁর সংশয়হীন বক্তব্যের লক্ষ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা হচ্ছে এই যে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো মমতার সব যোগ্যতাই আছে। দীর্ঘদিন সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন তিনি। এখন দক্ষতার সঙ্গে রাজ্য চালাচ্ছেন। দিল্লিতে সরকার চালাতে হলে এই ধরনের অভিজ্ঞতা একান্ত জরুরি। যা তাঁর রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মমতার সাহস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। তৃতীয়ত, জোট সরকারের বিভিন্ন দল ও মানুষের মধ্যে সমন্বয় গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা ও ক্ষমতা প্রমাণিত।

যশবন্ত সিং সুবক্তা। স্পষ্টবক্তা। দুর্নীতি, ইতিহাসের বিকৃতি আর ঘৃণার বিরুদ্ধে সবসময় সরব। পণ্ডিত মানুষ। মন্ত্রিত্বে প্রাক্তন হলেও রাজনীতিতে নন। বরং আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। সম্ভবত, সম্ভাব্য বিরোধী ঐক্যের নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ক্রমশ উজ্জ্বল, উজ্জ্বলতর হয়ে উঠবে। এরকম কোনো প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ যখন সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখন আমাদের ভাবতে হয়, খতিয়ে দেখতে হয় জাতির আশা ও আকাঙ্ক্ষার চেহারা। এসব প্রাসঙ্গিক ও ভবিষ্যতের বাধ্যবাধকতাকে এড়িয়ে যাবার উপায় থাকে না।

মমতার রাজনৈতিক ও সমাজমনস্ক মনোভাবকে, তাঁর লড়াইয়ের অভিমুখকে আঞ্চলিকতার অভিযোগ তুলে আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। যখন আচমকা ডি মানিটাইজেশন ও তার সুফল-কুফল নিয়ে বড়ো বড়ো অর্থনীতিবিদদেরও খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখা গিয়েছিল, সে মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী কঠোর ভাষায় বিমুদ্রায়নের নিন্দা করে বলেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত দানবিক। দেশের সর্বনাশ ডেকে আনবে।

ভুল বলেননি। তাঁর ওই তাত্ক্ষণিক  উপলব্ধি পরে অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে ওঠে।

এরও আগের কথা, কংগ্রেস আমলে টাডা আইন নিয়ে সংসদে, সংসদের বাইরে তাঁকে আমরা লড়াই করতে দেখেছি। টাডার প্রকোপ যে কী নৃশংস, অমানবিক, তা রাষ্ট্র বোঝেনি, বুঝেছিলেন তখনকার উদীয়মান নেত্রী। দলের অভ্যন্তরে তাঁর ওই লড়াই একক হলেও, দমে যাননি। জেদ আর আপসহীন সংকল্প নিয়ে লড়ে গেছেন। ভারত অবাক হয়ে তাঁর দুঃসাহস দেখেছে।

গত এক বছরে নানা ধরনের অন্যায় আর অসঙ্গতির মোকাবিলায় তাঁর ঝাঁঝালো আক্রমণের ভাষা কী? কঠোর অথচ অসংকীর্ণ। অসমে নাগরিকপঞ্জির নৈরাজ্যে মারাত্মক গাফিলতিতে প্রথম খসড়া তালিকা থেকে প্রথম দফায় বাদ পড়ে গেলেন দুকোটির বেশি ভারতীয় নাগরিক। দ্বিতীয় দফায়, সংশোধনের পরেও দেখা গেল, প্রায় ৪০ লাখ মানুষের ভাগ্য বিড়ম্বিত। মমতা দুই দফার বিভ্রান্তিকর তালিকা নিয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন। বললেন, এসব চলবে না। দলের মন্ত্রী ও নেতা-নেত্রীদের অসমে পাঠালেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোলাহল শুরু হয়ে গেল, বাঙালিকে উসকে দিচ্ছেন। অভিযোগ তুলল বামপন্থিদের বিভিন্ন গোষ্ঠী, কংগ্রেসও। মমতা অহেতুক সমালোচনায় কান দেননি। জানালেন, বাংলায় এরকম হয় না, হবে না। হতে দেব না। এ রাজ্যে সব প্রদেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করছেন। করবেন। অসমে যাঁরা ব্যবসা করতে বাধা পাচ্ছেন তারা এখানে আসুন। জায়গা, সুযোগ সবই দেব।

উজান অসমের তিনসুকিয়ার রহস্যময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন ৫ গরিব কৃষক। মমতা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধি দল পাঠালেন। তাঁর সদর্থক ভূমিকায় জন্ম নিল প্রাদেশিকতাহীন, বিদ্বেষহীন এক গভীর আবেগ। এনআরসি-র নৈরাজ্যে আক্রান্ত বহুভাষী, বহুধর্মীয় মানুষ আশ্বস্ত বোধ করল এই ভেবে যে, আর কেউ না থাক, মমতা আমাদের পাশে আছেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর এই মমত্ববোধ, নিবিড় সহানুভূতি কি উসকানি, প্রাদেশিকতা দুষ্ট?

গুজরাটে হঠাত্ ‘বিহারি খেদাও’ আরম্ভ হয়ে গেল। উদ্বিগ্ন মমতা বললেন, এসব বন্ধ হোক। ভারত ঘোষিতভাবেই বহুভাষীদের যুক্তরাষ্ট্র। সহাবস্থানের বহুত্ব তার ধর্ম। রুটি রোজগারের আশায় এক রাজ্যের মানুষ অন্য রাজ্যে পাড়ি দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। বিহারি, গুজরাটি, মারাঠি বলে কাউকে হয়রানি করা চলবে না। গুজরাটে সরকারের মুখ তখন গোমড়া। কালিমালিপ্ত। নানা অজুহাত তারা তৈরি করল কিন্তু বাংলার জননেত্রীর উত্কণ্ঠা আর ভাবাবেগকে প্রাদেশিকতার রটনা দিয়ে রুদ্ধ করা গেল না।

উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরের গ্রামে, সদ্যঘটিত সংঘর্ষে, বজরং দলের গুলিতে সুপরিকল্পিতভাবে সত্ ও সাহসী পুলিশ অফিসার সুবোধ সিং-এর মৃত্যু ও অশান্তি সৃষ্টির ঘটনায়ও মমতার সুদৃঢ় প্রতিবাদ, তীর্যক ভাষা ভারতবাসী অবাক হয়ে শুনল। সাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে, এমন সতর্ক তীক্ষ আক্রোশ দেশের অন্য কোনো নেতা বা নেত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো না। মমতা এখানেও একা নন। তাঁর পাশে আছে শান্তিপ্রিয় ভারতবাসী। আগামীতেও থাকবে। তাঁর প্রতি তাদের ভরসা, তাদের ভালোবাসা ক্রমাগত বাড়ছে। বাড়ছে আস্থা। যেমন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। তেমনি সমাজের সব স্তরে।

আমাদের একেক সময় মনে হয়, সুভাষচন্দ্র বসু ও বঙ্গবন্ধুর পর অন্য কোনো বাঙালি রাজনীতিক এই উপমহাদেশে এতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেননি। নেতাজির আবেগ, জনপ্রীতি ও দেশপ্রেমের বিস্তার যেমন শেখ মুজিবকে ঋদ্ধ করেছিল, তেমনি তা মমতার ভেতরে ও বাইরেও ক্রমাগত দীর্ঘ, দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। বঙ্গের এখনকার সর্বোচ্চ প্রশাসকের মুখচ্ছবিতে বাংলার আমজনতা তো বটেই, ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের ভিন ভাষীরাও অবাধ দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এমন একজন গ্রহণযোগ্য অবলম্বনযোগ্য আত্মীয়কে আবিষ্কার করছে, যিনি আক্ষরিক অর্থে ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় নেত্রী হয়ে উঠছেন, যিনি আঞ্চলিকতাহীন। ক্ষুদ্রতাহীন। ভাষা, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে যার অবস্থান। বাংলার এই মমতাকে আজ গভীর আশ্রয় ভাবছে বিচিত্র ভারত। বহুত্ববাদী ভারত।

ঘৃণা আর উগ্র জাতীয়বাদের মোকাবিলায় দেশের সব প্রান্তের বহুমুখী রাজনীতি সংঘবদ্ধ হতে চাইছে। মমতা অবশ্যই এই ঐক্যের অন্যতম শিরোমণি। ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা ঠিক করবেন জননারায়ণ। কিন্তু সম্ভাবনাময় বিরোধী ঐক্যের সূত্র ও গোত্র রচনায় বাংলার নেত্রীর হিসেব-নিকেশকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। রাজনীতির নয়, জনতার জোটই ঠিক করবে কে তাদের মুখ আর কোনদিকে চওড়া সর্বসম্মত রাজনীতির ইঙ্গিত।

n  লেখক: সম্পাদক, সর্বভারতীয় দৈনিক ‘যুগশঙ্খ’।

প্রধান সম্পাদক, মাসিক ‘আরম্ভ’।