ছেচল্লিশ বছর পার হয়ে গেলো। অথচ মনে হয়, এই তো মাত্র সেদিন জগন্নাথ হলের পূর্বদিকে শিব বাড়ির রাস্তা ধরে শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছি একজন যশস্বী দার্শনিকের পাশে-পাশে হেঁটে হেঁটে। সেই দার্শনিক ব্যক্তিটি ছিলেন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব যাকে আলবদর-আলশামস বাহিনীর জল্লাদেরা নির্মমভাবে হত্যা করে জগন্নাথ হলের মাঠে একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে। সেদিন এবং পরে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও বহু অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আর এদেশের কিছু বেঈমান বাঙালি কসাই। এদেরই চক্রান্তে আর কূটচালে পঁচাত্তরের আগস্টে সপরিবারে নিহত হন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ডিসেম্বর মাসের ১৪ তারিখ এলেই মনে পড়ে বিশেষভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা। স্মৃতিকাতর মন চলে যায় একাত্তরের নয় মাসের ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে গ্রাম এলাকা হয়ে উঠের্িছল রাজাকারদের কসাইখানা। তাদের ভীতিজনক উত্পাত দেখে রঙচটা লুঙ্গি আর পুরনো একটা হাফ শার্ট পরে কুমিল্লা থেকে যাত্রা করে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছলাম রাত প্রায় একটার দিকে। আতঙ্কিত মনে তাঁতীবাজারের এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম। পরেরদিন জগন্নাথ কলেজে পড়ুয়া এক আত্মীয়কে নিয়ে নয়াবাজারের দিকে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। গুটিকতক মানুষের সতর্ক আনাগোনা, রক্তাক্ত পিচঢালা পথ, আগুনে পোড়া সব দোকানপাট আর পচা ক্ষত-বিক্ষত লাশের দুর্গন্ধে ভারী পুরনো ঢাকার বাতাস। পলাশী মোড়ে এসে পরিচিত দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ-খবর নিয়ে আমার প্রিয় মাস্টারদা সূর্যসেন হল (তখন জিন্নাহ হল)-এ আমার ১০৮ নম্বর রুমটি দেখার জন্য কিছুদূর এগোতেই দেখি হানাদার বাহিনীর কয়েকজন সেনা মহসিন হলের মাঠে বসে গল্প-গুজবে মেতে আছে। আর এগুলাম না। নীলক্ষেতের পরিচিত একটি লেপের দোকানে বসলাম। তার কাছ থেকেই জানলাম সব। কর্মচারীদের গুলি করে আর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ঘটনার সাক্ষী, মধুর ক্যান্টিনের স্বত্বাধিকারী জীবন্ত ইতিহাস মধুদাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা অজানা ভয়ের স্রোত বয়ে গেল যখন শুনলাম ঋষিতুল্য অমায়িক শান্তশিষ্ট অজাতশত্রু সমসাময়িক কালের অন্যতম সেরা দার্শনিক অধ্যাপক জিসি দেবকে অসভ্য বর্বর হানাদাররা তাদের দোসর আলবদর বাহিনীর শয়তানতুল্য জল্লাদদের সহায়তায় শিববাড়ির বাসা থেকে টেনে-হিঁচড়ে জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে হলের ছাত্র-কর্মচারীদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মাটিচাপা দিয়ে হায়েনার উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। শুনলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে ধরে নিয়ে গেছে অজ্ঞাত স্থানে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাকেই পাচ্ছে তাকেই নির্বিচারে হত্যা করছে।
ভয়ঙ্কর দিনগুলো নিঃশব্দে কেটে যায়। ১৩ কী ১৪ ডিসেম্বর শুরু হয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ ঢাকার আকাশে। রেডিও’র খবর শুনে জানলাম ভারতীয় আর মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মিত্রবাহিনী আর কাদেরিয়া বাহিনী আসছে রাজধানীর দিকে। হানাদার বাহিনী পিছু হটছে। রাতেই রেডিও’র খবরে শুনলাম, কাল অর্থাত্ ১৬ ডিসেম্বর হানাদারবাহিনী মিত্রবাহিনীর নিকট রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করবে। সারা রাত কেউ আমরা ঘুমাইনি। অপেক্ষা করছি পূর্ব দিগন্তে কখন স্বাধীনতার লাল সূর্যটার উদয় হবে। সকাল প্রায় সাতটার দিকে নয়াবাজার হয়ে কয়েকজন মিলে ছুটলাম রেসকোর্স ময়দানের দিকে যে ময়দানে সত্তরের দিনগুলোতে রোজ ভোরে জিন্নাহ হল থেকে এসে জগিং করতাম। চলে এলাম রেসকোর্স ময়দানের পশ্চিম পাশের রাস্তায়। দেখি অগণিত লোকজনের মিছিল। আসছে তো আসছে, বেশুমার লোকজন চারদিক থেকে ছুটে আসছে।
বাংলা একাডেমির পাশে শিববাড়ির সরু রাস্তাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত কয়েকজন কর্মচারীকে পেয়ে গেলাম। তাদের কাছ থেকে শুনলাম বিগত কয়েক রাতের রোমহর্ষক ঘটনা। সিনিয়র অধ্যাপকদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যাওয়া, মেডিক্যাল সেন্টারের ডাক্তার মর্তুজাকে গুলি করে হত্যা, শিববাড়ির বস্তিবাসীদের নির্বিচারে মেরে ফেলা, রেসকোর্স ময়দানের বিখ্যাত কালীমন্দিরটি গুঁড়িয়ে দেয়া, আরও আরও সব ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা।
আমার স্মৃতিচারণের বেশির ভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যেখানে পার করেছি প্রায় অর্ধশত বছর, ছাত্র আর শিক্ষক হিসেবে। শহীদ মিনার রোড, ঈশা খাঁ রোড, আনন্দবাজার কোয়ার্টার, নীলক্ষেত আবাসিক এলাকা, জগন্নাথ হলের সড়কগুলো দিয়ে যতবার হেঁটেছি মনের ভেতরে গুমরে উঠেছে আর্তনাদ, হাহাকার আর গোঙানির আওয়াজ। প্রিয় শিক্ষকদের মুখগুলো ভেসে উঠেছে মানসপটে। জেনেছিলাম, বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ২৫ মার্চের আগেই। আর এ জঘন্য কূটকৌশল আঁটে মেজর জেনারেল ফরমান আলী যার ডায়েরি থেকে বুদ্ধিজীবীদের একটা তালিকায় সারাদেশের হাজারখানেক প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের নাম পাওয়া যায়। তবে হত্যার মূল ক্ষেত্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জেনেছি, প্রথম হামলা হয় নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার ২৩ নং বাড়িতে যেখানে দুই আত্মীয়সহ মৃত্তিকা বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ফজলুল রহমানকে হত্যা করা হয়। এরপর হানা দেয় অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও রাশিদুল হাসান স্যারের বাসায়। কিন্তু বিদ্যুিবহীন অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে যায় হানাদার পশুরা। উভয় শিক্ষক ওই রাতে প্রাণে বেঁচে গেলেও আলবদর বাহিনী তাদের ঠিকানা খুঁজে বের করে পরে তাদের হত্যা করে। ২৪ নং বাড়ির বাসিন্দা বাংলার অধ্যাপক ও নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলামের বাসার সামনে আহত এক নারীর রক্ত দেখে হার্মাদের দল ফিরে যায়। প্রাণে বেঁচে যান স্যার। কিন্তু বাঁচতে পারেননি ফুলার রোডের বাসায় থাকা ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মুক্তাদির। তাদের টার্েগট ছিল প্রগতিশীল, স্বাধীনচেতা, দেশপ্রেমিক শিক্ষক/বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে মেধাশূন্যতা তৈরি করে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশকে পঙ্গু জাতির দেশে পরিণত করা।
কী অপরাধ করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ? নিভৃতচারী কবি মেহেরুন্নেছাকে কী অপরাধে বিহারি অধ্যুষিত মিরপুরের বাসায় গলা কেটে তারই চুল দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল ফ্যানের সাথে? অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. হাবিবুর রহমান, ড. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, ড. রাশিদুল হাসান, সুখরঞ্জন সরকার, মীর আবদুল কাইয়ূম, শহীদুল্লাহ কায়সার আর জহির রায়হান কী দোষ করেছিলেন? সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন গোলাম মোস্তফা, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামউদ্দিন আহমেদ, শহীদ সাবের, সেলিনা পারভীন, শেখ আবদুল মান্নানসহ আরও অনেক প্রখ্যাত সাংবাদিক কি জনজাগরণের কথা লিখে অন্যায় করেছিলেন? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর আবদুল কাইয়ূমকে কেন পদ্মার তীরে জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছিল? ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে কী কারণে জীবন্ত অবস্থায় বাঘের খাঁচায় ফেলে দেয়া হয়েছিল? মাগুরার শিক্ষিকা লুত্ফুন্নাহার হেলেনকে কেন জীপের পেছনে বেঁধে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে শহরের রাস্তায় ঘুরিয়ে হত্যা করা হয়েছিল? যশোরের আইনজীবী মশিউর রহমানের চেহারা কী কারণে বীভত্সভাবে বিকৃত করে দেয়া হয়েছিল? সৈয়দপুরের ডাক্তার শামশাদ আলীকে কোন্ অপরাধে ্ট্রেনের জ্বলন্ত কয়লার ইঞ্জিনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল? সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, পাকশী, ঈশ্বরদী, পাহাড়তলীতে ট্রেনের ইঞ্জিন সবসময় জ্বালিয়ে রাখা হতো বুদ্ধিজীবীসহ অন্যদের পোড়ানোর জন্য।
ধর্মের ধ্বজাধারী পাকিস্তানি আর এদেশীয় বেঈমানরা এভাবে সারা দেশের শত শত বুদ্ধজীবীকে হত্যা করে। পরিকল্পনা আর আয়োজন ছিল আরও ব্যাপক। নিষ্ঠুরভাবে সারাদেশে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজকে আলবদর বাহিনীর সদর দপ্তর বানিয়ে চলে এ হত্যাযজ্ঞ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসন্ন দেখে তারা ভীষণভাবে ঘাবড়ে গিয়েছিল। পরাজয়ের চরম মুহূর্তে তারা নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল তাদেরকে যারা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এদেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে অধিকার-সচেতন করে তুলেছিলেন, দেশব্যাপী রাজনৈতিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন আর পাকিস্তানি শাসকদের সৃষ্ট বৈষম্য, শোষণ আর সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার হরণের বিষয়গুলো স্পষ্ট করে বাঙালিদের হূদয়ে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে দিয়েছিলেন।
এ লেখনি আর কতো লিখবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিধনের মর্মন্তুদ বেদনার কাহিনি! এ বছরের শেষদিনের আগের দিনই জাতীয় সংসদের নির্বাচন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মনেপ্রাণে কামনা করছি, তরুণ প্রজন্মের প্রথম ভোটটি যাবে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির ঘরে, আর বাংলাদেশের সকল নারীর সমর্থন থাকবে তাদের বিপক্ষে যারা একাত্তরে তাদেরই মতো মা-বোনদের মানসম্মানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি, যে মা-বোনেরা অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছেন স্বাধীনতার জন্য সেই নারীসমাজ শুধু নয়, বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক মাত্রই তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যারা অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও জিইয়ে রেখেছেন এতোদিন, তাদেরকে সমর্থন দিয়ে আমরাই সম্মান দেখাতে পারি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। এতে কিছুটা হলেও তাদের ঋণ পরিশোধ হবে।
n লেখক: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ৃৃৃ
