সন্তানের সামনেই জন্মদাতা মা-বাবার জন্য ‘কেমন সন্তান জন্ম দিয়েছেন’ কিংবা ‘কেমন ভাবে সন্তান মানুষ করেছেন’ বাক্যগুলো শোনা এবং সহ্য করা অনেক কষ্টের। সন্তান ও জন্মদাতা মা-বাবার জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর হতে পারে না। অরিত্রীও সহ্য করতে পারেনি বলে বড় অভিমান নিয়ে ধরিত্রীকে বিদায় জানিয়েছে সে। অরিত্রির এভাবে চলে যাওয়া তার সহপাঠীদের জন্য দুঃসহ হওয়ায় ‘এডুকেশন এনলাইটেড আস, ইট ডাজ নট কিল আস’; ‘শাসন করুন, অপমান নয়’; ‘নো স্টুডেন্ট ডিজার্ভ টু বি ইনসালটেড’ এমনি বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড নিয়ে কিংবা শিক্ষামন্ত্রীর সামনে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদে উত্তাল রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ক্যাম্পাস বর্তমানে শান্ত। এখন সুশিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে ক্লাস-পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেই ব্যাপারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও ‘গর্ভনিং বডি’কে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়াসহ সচেতন হতে হবে।
আচার-ব্যবহারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে যে শিক্ষক সচেতন নন, তার পাঠদানে শিক্ষার্থীদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৭১ জন শিক্ষার্থী শিক্ষক কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে দুইজন আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন ফি ধার্যের নামে অধিক অর্থ আদায়, আর্থিক দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও মোটা অঙ্কের ভর্তি বাণিজ্য পুরাতন অভিযোগ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এমন অনিয়মের সাথে অভ্যস্ত হওয়া চাপা ক্ষোভ কখনো প্রকাশ পায়, কখনো পায় না। সময়মতো উপযুক্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ না নেওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করে, আর ঢালাওভাবে দোষ হয় শিক্ষকের, সরকারের, মন্ত্রণালয়ের কিংবা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার।
মাসিক বেতন, ভর্তি ফরম, নতুন ভর্তি, পুনঃভর্তি, ‘সিকিউরিটি মানি’, ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিংয়ে বাধ্য করা, ভর্তি ও গাইড বাণিজ্য, কোচিং ফি, প্রগেস রিপোর্ট, মার্কশিট, ছাড়পত্র, প্রত্যয়নপত্র, খেলাধুলা, স্কাউট, গার্লস গাইড, দরিদ্র তহবিল, মিলাদ, সাময়িকী, পাঠাগার, সিলেবাস, প্রসপেকটাস, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার, প্রযুক্তি ফি, স্কুলের নির্ধারিত নোট বই, গাইড বই, খাতা বাবদ, ডায়েরি বাবদ, পরিচয়পত্র বাবদ, পিকনিক, ঈদ পুনর্মিলনী নামে এবং ‘বিবিধ’ বেনামে অর্থ আদায় খাতের শেষ নেই। অভিভাবকদের অভিযোগ, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষকই ‘পুলিশের মতো’ আচরণ করেন। শিক্ষার্থীদেরকে তাচ্ছিল্য করেন। চলে মানসিকভাবে নানা অত্যাচারও। কোনো শিক্ষার্থীকে মানসিক বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করা গর্হিত অপরাধের শামিল। এ অধিকার রাষ্ট্র কোনো শিক্ষককে প্রদান করেনি। প্রশ্ন হলো, শিক্ষককে শেখাবে কে? মানুষ গড়ার কারিগর যখন ভর্তি বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো নিকৃষ্ট কাজের সাথে সম্পৃক্ত, তখন সেইসব শিক্ষকদের কাছে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা নিশ্চয় অমূলক হবে।
অরিত্রির আত্মহত্যা আজ শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে শুধু মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নয় বরং গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অরিত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় হাইকোর্ট এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের উপায় নির্ণয় করে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ নিতে রুল জারি করেছেন। আজ যারা শিক্ষক তাদের ছাত্রজীবনও কি এমন ছিল? নিশ্চয় ছিল না। শিক্ষকতা পেশার কেন এই পরিণতি তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। বিভিন্ন পরিবারের সন্তান একসঙ্গে পড়ালেখা করলে সেখানে একাডেমিক বিষয় দেখার পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক, আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো দেখার জন্য নিয়মিত ‘কাউন্সেলিং’ দরকার। সে জন্য মনোবিদই লাগবে এমন কথা নেই। এক একজন প্রকৃত শিক্ষকই তার শিক্ষার্থীর মন ও জ্ঞান জগত্ বিকাশের জন্য যথেষ্ট।
‘শিক্ষকতা সবার জন্য নয়’—এই বাস্তব সত্যটি উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে কি কেউ? মসজিদের ইমাম, মন্দির, গির্জা কিংবা প্যাগোডার পুরোহিত হতে গেলে যেমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হয়, তেমনি শিক্ষক হতে গেলে অবশ্যই বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মেধাবী মানুষ হওয়া দরকার যারা শিক্ষা নিয়ে খেলতে পারে, খেলাতে পারে এবং মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘন্টার পর ঘন্টা পাঠদানকে মোহনীয় করে রাখতে পারে। যে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে সন্তানের মতো স্নেহ-মমতা দিতে পারেন না, তার শাসন করার অধিকার নেই। স্নেহ-মমতা দেওয়ার প্রবণতার চেয়ে শাসন বেশি হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতেই থাকবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা ভুল থেকেই শিখে থাকে। উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগে, শিক্ষকের মর্যাদা প্রদানে ও প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র যাকে-তাকে শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশাধিকার দিতে পারে না। মেধাবীরা শিক্ষকতায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলেই এমন অবিবেচক শিক্ষকতা রাষ্ট্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বারবার।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে দেশের নীতিনির্ধারকদের আরো সংবেদনশীল হতে হবে।
n লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক সুশাসন বিষয়ক পিএইচডি গবেষক, জেঝিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন
এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।
