লেখকের সঙ্গে এক সন্ধ্যা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৫২

গত সংখ্যার পর

 

তখন সে বুঝতে পারছিল যে, তিনি নিজের জন্যই কাঁদছিলেন। ‘আমি তোমাকে চারটা চিঠি লিখেছি’, তবে পঞ্চম চিঠিতে মনে করালেন, ‘তবে সেগুলো আমি পাঠাইনি। ওগুলো একটা ক্ষত জাগিয়ে তুলছিল, যা এতদিনে নিরাময় হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তুমি এত সুন্দর, এত তরুণ, যেন পৃথিবী তোমাকে মোটেই স্পর্শ করেনি। একজন দেবদূতের মতো তুমি অন্য কোনো জায়গা থেকে এসেছ। যতই আমি পাইনি, ততই আমি তোমাকে কামনা করেছি।’ এই চিঠিটা তার কাছে একটু বিব্রতকর মনে হলো, যদিও সে মোটেই জানে না কেন। যেন এটা অন্য কারো কাছ থেকে এসেছে। 

তার মনোযোগ আচ্ছন্ন করা মানুষের ছোট ভিড়টি মরমর শব্দ করে নড়াচড়া করতে লাগল। ফুলের তোড়া হাতে বসে থাকা যুবকটি বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। কালো স্যুটপরা ভদ্রলোকটি অস্থিরভাবে রুমাল দিয়ে তার মনোকলটি পরিষ্কার করতে লাগলেন। বয়স্ক শিক্ষকটি ছাত্রছাত্রীদেরকে দুই সারিতে দাঁড় করাবার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করে চললেন। এবং তখন সে বুঝতে পারল, এই লোকগুলো তার জন্যই অপেক্ষা করছে। সেই টি.। যিনি এখন আর তার নন এবং সবসময় অন্যের ছিলেন। এই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, স্যুটপরা ভদ্রলোকটি, ফুল হাতে যুবকটি, রিসিপশনিস্ট এবং তার বইপড়া স্ত্রী, এই মানুষগুলো সবাই তাকে দখল করে রেখেছে। 

কিন্তু ওরা তার সম্পর্কে আসলে কতটুকু জানে? ওরা কি তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস, কিংবা বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ছাপা ছোটগল্পগুলো থেকে তাকে জেনেছে? তাহলে ওরা কাকে জেনেছে? তিনি যা কিছু লিখেছেন, তাতে নিজের সম্পর্কে খুবই সামান্যই আছে, নামমাত্র ছিটেফোঁটা বলা যায়। তার নিখুঁত, পরিষ্কার, বিশ্বাসযোগ্য বাক্যগুলোতে কি তাকে পাওয়া যায়? ভেনিসে যখন ওরা কেবল হেঁটেই বেড়াচ্ছিল, তখন তিনি ছোট ছোট বাক্যে হঠাত্ হঠাত্ কথা বলতে শুরু করতেন এবং সে সবসময় খুঁজে বের করার চেষ্টা করত, তার কথাগুলোর মাঝে কোনো বিরতি কিংবা একটা কমা আছে কি না। তার লিখিত বর্ণনায়, ছোট ছোট সত্য কাহিনিগুলোতে কি তার অস্তিত্ব আছে? তিনি তো এমনকি রসিকতাও করতে পারতেন না। কীভাবে তিনি মানুষকে বোকা বানালেন ভুল বুঝতে যে, তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে তার নিজেকে নিয়েই রচিত। আসলে এটা তার জন্য সহজ ছিল। কিংবা হয়তো তা নয়, হয়তো তাকেই বোকা বানানো হয়েছে। ভালোবাসা আর কামনায় বেহুঁশ হয়ে সে সম্পূর্ণ অন্য কোনো মানুষকে দেখেছে। না, তার রচিত কোনো বাক্য থেকেই সে তাকে চিনতে পারেনি। তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কোনো বীরত্বপূর্ণ কাহিনির নিরপেক্ষ বর্ণনাকারীর মাঝেও তিনি ছিলেন না। সেখানে তিনি কথা বলছিলেন না। এটা আসলেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি ব্যাপার, জীবন্ত একটি সত্তা থেকে কাউকে খুঁজে বের করা, যিনি জগত্ সৃষ্টি করেন। জগতের শাসক। যখন তিনি ঘুমিয়ে রয়েছেন, তখন তার নিঃশ্বাসে এটা খুঁজে বেড়ানো, পেছন দিকে হেলান দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টিসীমার বাইরে আর তার দুই চোখের পেছনে কী লুকানো আছে তা খোঁজার চেষ্টা করা; আইসক্রিম খাওয়ার সময়, তাকে লক্ষ করা যে, অন্যরা যেভাবে এটা পছন্দ করে, তিনিও কি তাদের মতো এটা পছন্দ করেন। অন্যান্য মানুষের স্নায়ুর মতো তার স্নায়ুও কি তার মস্তিষ্কে ইঙ্গিত বহন করে? এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নিশ্চয়ই আছে। হঠাত্ তার মনে পড়ল ভেনিসে তিনি তখন গোঁফ রাখতে শুরু করেছিলেন। যান্ত্রিকভাবে তার আঙুল চলে যেত ওপরের ঠোঁটে, সেখানে কালো খসখসে গোঁফে আঙুলের ডগা বুলিয়ে তিনি আনন্দ পেতেন।

ট্রেন আসছে। ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় ওদের মাথার ওপর প্রায় ধরাছোঁয়া যায় এমন একটি আকৃতি তৈরি হলো। ওর বুক ধকধক করতে শুরু করল আর ঠোঁট শুকিয়ে গেল। সে স্টেশনের রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ডের আড়ালে পিছিয়ে এসে তার অবগুণ্ঠনটা নামিয়ে দিল। একটা সংক্ষিপ্ত মুহূর্তের জন্য ট্রেনটা সেখানে থামল এবং কিছুই হলো না। একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্টেশন স্তব্ধ হয়ে রইল। সেই চার জন লোকের চোখ এক কমপার্টমেন্ট থেকে আরেক কমপার্টমেন্টের দিকে ঘুরতে লাগল। তারপর সে লক্ষ করল দলটি হঠাত্ ডানদিকে ছুটছে, ইঞ্জিনের দিকে। দুই বাচ্চাসহ সবার অগোচরে থাকা সেই মহিলাটিও সেদিকে চলেছেন। ফুল হাতে লোকটি সবার আগে প্রায় দৌড়াচ্ছিল।

সে তাকে কেবল একবার দেখল, যখন তিনি স্টেশনের দরজা দিয়ে বাইরে যাচ্ছিলেন, ছোটখাটো একটি ভিড় তাকে ঘিরে রেখেছিল। সে অবাক হয়ে দেখল, তিনি এখন ভীষণ মোটা হয়েছেন, আক্ষরিকভাবে বলা যায় বেঢপ বা বিসদৃশ হয়েছেন। সেই একই মুখ, যা সে খুব ভালো চিনল, তবে এখন ভিন্ন রকম দেখাচ্ছে, যেন বাস্তবতার মাঝে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে। তারপর অস্পষ্ট হয়ে গেলেন। যুবকটি একটি অটোগ্রাফ অ্যালবাম বাড়িয়ে ধরল সই করার জন্য, মনোকল চোখে লোকটি নিজের শরীর দিয়ে তাকে প্রায় ঢেকে রেখেছে। আর তিনি ছিলেন ঝড়ের চোখের মতো—ধূসর, শান্ত, যেন কিছুই আর তাকে এখন অবাক করতে পারে না।   

তাহলে এখন নয়। পরে। তার বুক শান্ত হলো। সে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। লক্ষ করল ওরা একটা গাড়িতে উঠেছে।

‘লেখকের সঙ্গে এক সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠানটি টাউন থিয়েটারে হওয়ার কথা। এ বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপন সাঁটা হয়েছিল। ‘বিখ্যাত লেখক টি. আজ একটি লেখা পাঠ করবেন...’ সে প্রথমেই ঢুকে পড়ল। লোকজন ধীরে ধীরে অডিটরিয়ামে আসছিল। মহিলারা সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে এসেছে। ওদের ভুঁড়িওয়ালা স্বামীরা ওয়েস্টকোটে ঘড়ির চেইন লাগিয়ে এসেছেন, সময়ের সাথে অস্থিরতায় ভুগছিলেন। অ্যালেনস্টেইনের বুর্জোয়া। এবং আরো পরিমিত পোশাকে কিছু মানুষ এসেছেন—সম্ভবত শিক্ষকবৃন্দ, আত্মসচেতন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। স্টেশনের সেই যুবকটিও ছিল, তবে এবার হাতে ফুলের তোড়াটা নেই।  তিন জন মহিলা অবিরাম হাসছিল আর চোখের পাতা পিটপিট করছিল। এরা কি অভিনেত্রী? একদল ছাত্র। আচ্ছা তাহলে এরাই হচ্ছে মহান এবং বিখ্যাত লেখক টি.-এর পাঠক, তার পূর্ব প্রুশিয়ার ভক্ত।

‘লেখালেখি ছাড়া জীবনের আর কিছুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি জানি তুমি আমাকে বুঝতে পারবে।’ এভাবেই তার কাছ থেকে শেষ পাওয়া চিঠিটা শেষ হয়েছিল। সে বুঝতে পারেনি। তার মতে এখানে একটা অমিল ছিল, তবে সেটা সে খুঁজে পেল না। তার কাছে টাকা ছিল; তিনি তার সাথে ভেনিস কিংবা অন্য কোথাও থেকে, লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারতেন। হয়তো এটাই ছিল সমস্যা। হয়তো সে যথেষ্ট শিক্ষিত ছিল না, হয়তো তার পরিবার তেমন উচ্চ পর্যায়ের ছিল না। তার মনে পড়ল, যখন তিনি ‘প্রফেসর,’ শব্দটা শুনলেন তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করলেন। এটা বেশ অদ্ভুত মনে হচ্ছিল যে, তার মতো একজন মানুষের গ্ল্যামারের প্রতি এমন আকর্ষণ ছিল। শেষপর্যন্ত অবশ্য তিনি একজন অধ্যাপকের মেয়েকেই বিয়ে করলেন। এটা কি সম্ভব যে, ওদের ভেনিসের পর্বের পর পুরো এক বছর পার হতে না হতেই তিনি আরেকজনকে বিয়ের প্রস্তাব করলেন এবং অন্য কারো প্রেমে পড়তে পারেন? তবে তার বিশ্বাস হয় না যে অন্য মানুষটিকেও তিনি ভালোবাসেন; এখানে নিশ্চয়ই কোনো একটা দূরবর্তী অভিসন্ধি আছে, এটা নিশ্চয়ই কোনো একটা নিরস বা অর্থহীন ছোটগল্পের শুরু। কেননা একজন নিশ্চয়ই কেবল ভালো জিনিস নিয়ে লেখেন না; এখানে সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতি আছে। তখন তার বিশেষত্ব ছিল কৈফিয়ত খুঁজে বের করা। আর এগুলোর একটার সঙ্গে আরেকটার মিল ছিল না।  

সে তাকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেছিল। তবে কোনো উত্তর পায়নি। তিনি হয়তো চিঠিটা পড়তে পড়তে, দলামোচা করে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছেন। কিংবা হয়তো পুড়িয়ে ফেলেছেন, তাকে তো তার আত্মজীবনীর কথাটা ভাবতে হবে, এ বিষয়টাকে যথোপযুক্ত একটি জায়গায় তাকে তুলে ধরতে হবে। একজন মানুষ তার জীবনে যা চায়, এটা নিশ্চয়ই সেরকম কোনো বিষয় ছিল না। জীবন আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে, এমন লক্ষ বাস্তবায়িত করে, যা আমরা দেখতে পাই না, এর পেছনে পেছনে আমাদের টেনে নিয়ে চলে। এই চিন্তাটা হঠাত্ তাকে এমন আতঙ্কিত করল যে, তার ইচ্ছা হলো যেন এখনি শহরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে।

তারপর তিনি আর তাকে একটি শব্দও লিখেননি। সে জানতে পারল যে, তিনি বিয়ে করেছেন এবং সেখানে তার ছেলেমেয়েও হয়েছে। দুই কিংবা তিনটি। যখনই পত্রিকায় তার নাম আসে, সে খুঁজে বের করার চেষ্টা করত, সেখানে তাকে ইঙ্গিত করে কিছু বলা হয়েছে কি না। সে পড়ল, যা তিনি ঠিক একইভাবে লিখেছেন। একটা বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে পড়ল যে, তিনি যা কিছু লিখেছেন, তার মধ্যে হয়তো তার জন্য কিছু লুকোনো ইঙ্গিত রয়েছে, যে তিনি তার জন্যই লিখেছেন এবং এভাবেই হয়তো সেই ভয়ংকর বাক্যটার একটা ব্যাখ্যা করবেন :‘লেখালেখি ছাড়া জীবনের আর কিছুরই আমার কাছে গুরুত্ব নেই।’

যে হলঘরটিতে পাঠক্রম শুরু হবে, লোকজন ধীরে ধীরে সেখানে বসতে শুরু করল। সেও অন্যদের সঙ্গে ঢুকে লাল ভেলভেট ক্লথে ঢাকা টেবিলটি থেকে যতদূর সম্ভব দূরে বসল। কামরায় কোনো স্বাভাবিক আলো না থাকায়, কেবল একটু ওপর থেকে টেবিলটির ওপর আলো ফেলা হয়েছিল। এটা ভালোই হলো। ওখান থেকে তিনি তাকে দেখতে পাবেন না। স্পটলাইটের আলোয় তার চোখ ঝলসে যাবে। 

একটা নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রোতাবৃন্দ ফিসফিস করে কথা বলছিল আর হলের চারদিকে তাকাচ্ছিল। একজন ফটোগ্রাফার নিঃশব্দে একটা তেপায়া বসাল। অবশেষে দরজা থেকে মৃদু গুঞ্জন ভেসে এল। রক্তমাংসের শরীরে টি. সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। তাকে নিখুঁত দেখাচ্ছিল। অন্য সবার থেকে তিনি ভিন্নরকম ছিলেন, তবে সে জানে না ঠিক কী রকম। তার মধ্য থেকে একধরনের বিশুদ্ধতা ঝরে পড়ছিল—তার দাড়িকামানো ফ্যাকাশে মুখ, সাদা শার্ট, শার্টের শক্ত কলার, রুপালি চশমা। ধূসর স্যুট। ওখান থেকে সে তার জুতাজোড়া দেখতে পাচ্ছিল না, তবে হঠাত্ তার মনে পড়ল দশ বছর আগে জুতাজোড়া কেমন ছিল—বাদামি, সরু ডগা, একটু বাঁকা। এবং মনে পড়ল তার নগ্ন পায়ের কথা, যা স্বীকারোক্তির চেয়েও অনেক প্রকাশ্য। সে মনে মনে কল্পনা করল যে, তিনি খালিপায়ে অডিটোরিয়ামে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।

তার বেশ বয়স হয়েছে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জনতার দিকে তিনি তাকালেন না। হাতলদেওয়া চেয়ারে আরাম করে বসলেন। একটা পানির জগ আর গ্লাস তার সামনে রাখা হলো। তিনি সেটা ঠেলে একপাশে সরিয়ে দিলেন। কোটের ভেতরের পকেট থেকে কিছু কাগজ বের করে গলা পরিষ্কার করলেন এবং কেবল তারপর অডিটোরিয়ামের দিকে তাকালেন। তিনি তীর্যকভাবে তাকালেন। সে একটু কেঁপে উঠল, কেননা একটা মুহূর্তের জন্য সে অনুভব করল যেন তার দৃষ্টি তার শরীরের ওপর পড়েছে। তবে তিনি তাকে চিনতে পারেননি। তবে এতদূর থেকে চেনারও কথা নয়। সে অবশ্য যেকোনো লোকের ভিড়ে তাকে দেখলেই চিনতে পারবে। যেকোনো দূরত্ব থেকে।

তিনি শুরু করলেন, ‘ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ, আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, আমার অবস্থান নিয়ে আলোচনা করার জন্য...’।

শহরটি সম্পর্কে তিনি কিছুই বললেন না, বিমুগ্ধ শ্রোতৃমণ্ডলীর দিকে তাকিয়ে একবারও হাসলেন না, আবার তাদের দিকে ফিরে তাকালেন না, ফুলের তোড়া উপহার এবং এই উত্তেজনার জন্যও ওদের ধন্যবাদ জানালেন না। নিজের পরিচয় তুলে ধরলেন না, বললেন না, তিনি কে এবং কেন এখানে এসেছেন এবং ব্যাপারটা তিনি পছন্দ করেছেন কি না। মে মাসের রৌদ্র, মহিলাদের হ্যাট এবং তাদের স্বামীদের ঘড়ির চেইনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কিছুই বললেন না। একবারও তোতলালেন না বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন না। মুখে কোনো ধরনের অভিব্যক্তি নেই। পরিষ্কারভাবে কথা বললেন, তবে একটু একঘেয়েভাবে; কেবল একবার টাইটা ঠিক করলেন। তিনি নিশ্চয়ই তাদের সামনে নিজেকে এভরিম্যান, একজন বিশ্বজনীন ইউরোপীয় লেখক, উদাসীন জ্ঞানী, উদাসীন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই মনে করেছেন যে, অনিশ্চয়তার পেছনে লুকিয়ে থাকাটা একটা গুণ। অভিজাত মার্জিত ভাব, এর বেশি নয় কমও নয়। এটা তার পরিচিত ছিল, বেশ পরিচিত। এই ব্যাপারটা বেশ উত্তেজক ছিল, তবে কেবল যখন সে জানত যে, মুখোশটা যেকোনো মুহূর্তে খুলে পড়বে। এই বৈপরীত্যটাই ছিল উত্তেজনাদায়ক। ঠিক তার এই জিনিসটাই সে ভালোবাসত। তিনি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছিলেন।

বেশ শান্তভাবে মূল প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছিলেন। মাঝে মাঝে থেমে নীল চোখদুটো তুলে ছাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন। বিরতিগুলো ছিল, কমা, স্পেস, ড্যাশ। সত্যিই বেশ উন্নতি করেছেন। তিনি সংগীত সম্পর্কে কথা বললেন, তবে সাহিত্য সম্পর্কে নয়। শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে কেউ কেউ হয়তো হতাশ হয়েছিলেন, কেননা একজন লেখকের কি সাহিত্য সম্পর্কে কথা বলা উচিত নয়? 

‘...এবং একক সংগীত যখন প্রকৃতি বদলে বহুস্বরতা, ঐক্যতানের দিকে যায়, তার সঙ্গে এর মনে হয় সম্পর্ক রয়েছে। যা সাধারণত একধরনের উন্নতি হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও এটা আসলে বর্বরদের একটি বিজয়...’ ব্যস এতটুকু সে উপলব্ধি করতে পারল। 

তার মুখ তার ওপর ঝুঁকে রয়েছে, মাধ্যাকর্ষণের টানে পরিবর্তিত হয়েছে। একটি বালকের হাসি—কিছুটা নিষ্পাপ, কিছুটা নিষ্ঠুর। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে রয়েছে, ভোগসুখে নয়। ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। একটা বোতাম ছিঁড়ে গেল।

যখন তিনি বলা শেষ করলেন, তখন সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগল যেন তিনি একজন বিখ্যাত অপেরা গায়ক। তারপর কয়েকজন লোক টেবিলের দিকে এগোল। তিনি পকেট থেকে একটা চকচকে কলম বের করলেন। তার বইগুলোর ওপর একটু ঝুঁকলেন।

সে বেরিয়ে এল। দ্রুত হোটেলের দিকে চলল। এখন সে দুইবার, তিনবার, বহুবার একাকীত্ব অনুভব করে হতাশায় প্রায় ভেঙে পড়ছিল। এখানে কিছুই সে পরিবর্তন করতে পারে না। ঈশ্বর তাকে যা দিয়েছেন, তার জন্য কেন সে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে পারছে না? এটা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা কী এমন কষ্ট ছিল? কেন একজন মানুষ সবসময় সেই জিনিস চায়, যা তার নেই? মানবচিন্তার এই ত্রুটি কোথা থেকে এসেছে?

রিসিপশনে কেউ নেই। কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে সে একমুহূর্ত রিসিপশনিস্টের জন্য অপেক্ষা করল, তবে সে এল না। হয়তো সেও থিয়েটারে গেছে। চাবির দিকে সে এক হাত বাড়াল, তারপর কোনোকিছু না ভেবে অন্য চাবিটা আঁকড়ে ধরল, যেটা রোমান সংখ্যা I থেকে ঝুলছিল। কী রকম অমনোযোগী! কীভাবে ওরা সেই চাবিটা এখানে ঝুলিয়ে রাখতে পারল? তারপর সে একটা চোরের মতো সিঁড়ির দিকে ছুটল।

বেশ সাবধানে স্যুটের দরজাটা খুলল। লাইট জ্বালানোর দরকার পড়ল না—অস্তমান সূর্যের আলোয় কামরায় উষ্ণ উজ্জলতা ছড়িয়ে রয়েছে। বিশাল একটা ব্যালকনি, পর্দাগুলো দুই পাশে সরানো আর একটি কিংসাইজ খাট। তিনি স্যুটকেস থেকে জিনিসপত্র বের করারও সময় পাননি, স্যুটকেসটা বিছানার ওপর পড়ে রয়েছে। পাশেই তার সদ্য প্রকাশিত বইটির তিনটি কপি পড়ে রয়েছে, ঝকঝকে নতুন। আর্মচেয়ারের ওপর একটা ভেজা তোয়ালে দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত তার আগমন উপলক্ষে হোটেলের তরফ থেকে এটা কেনা হয়েছে। সে বেশ সাবধানে তোয়ালেটা স্পর্শ করল। কাছেই একটা বড় বাথরুম, জানালার পাশেই বড় একটা বাথটাব, তাতে পিতলের প্রুশিয়ান কল লাগানো রয়েছে, সাথে একটা প্যাডেস্টালের ওপর একটা ওয়াশস্ট্যান্ড। ওয়াশস্ট্যান্ডের ওপর—একইরকম কাঠের সাবানদানি। সে ভাবল, এটা অসম্ভব। জিনিসটা হাতে নিয়ে এর গন্ধটা শুঁকল। পরিচিত একটা গন্ধ, যদিও সে আশা করেছিল এটা তার মনে আরো গভীর দাগ কাটবে। বিভিন্ন দোকানে সে কতবার এটা খুঁজে বেরিয়েছে আর না পেয়ে হতাশ হয়েছিল। ভেজা শেভিং ব্রাশ—যাওয়ার আগে নিশ্চয়ই দাড়ি কামিয়েছেন। টুথব্রাশটা শুকনো। মেঝের টাইলের ওপর তার কালো মোজাজোড়া পড়ে রয়েছে। সে বাথটাবের কিনারায় বসল এবং অদ্ভুত একটা কথা ভাবল :তাকে যথোচিতভাবে ভালোবাসতে হলে, সে তার মতোই হতে চাইবে। তার ভেতরে যেতে হবে। তার নিজের হাত দিয়েই তার দেহে হাত বুলাতে হবে, তিনি নিজে যেভাবে নিজের যত্ন নেন, তার চেয়েও আরো ভালোভাবে যত্ন নিতে হবে। সে ভাবল, যদি আমরা দুজনেই সেখানে থাকতাম। তিনি লিখতেন, যদি এটা তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো আর আমি তার যত্ন নিতাম। সেখানে কোনো পাপ, কোনো ছাড়াছাড়ি, কোনো অনিবার্যতা থাকত না। এটা কেবল একজনের নিজেকে নিষ্পাপ ভালোবাসা হতো, বাথরুমের চ্যাপেলের মাঝে স্নেহপরায়ণতা। তার নিজের শরীর স্পর্শ করাটা আসলে সস্নেহে স্পর্শ বা সোহাগ করা নয়, কেননা এটা তো এমনকি ভালোবাসারও ব্যাপার নয়, এটা ছিল তার চামড়ার জন্য সেরা সাবানটা আবিষ্কার করা। সে ভাবল, ‘আমি তোমার দেহের প্রতিটা সেন্টিমিটার মুখস্থ করতে চাই। আমি তার মুখের ভেতরটা তার নিজের জিহ্বার মতো জানতে চাই, তার প্রত্যেকটা দাঁতের আকার; তার গায়ের গন্ধ কখনো আমার কাছে অন্য কারো গন্ধ মনে হবে না, কেননা এটা আমার নিজের গন্ধ হবে। আমি তাকে সযত্নে ধরে রাখতাম।’    

নিচতলা থেকে একটা শব্দ শুনেই সে কামরা থেকে ছুটে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে তার নিজের কামরার দিকে চলল।

ডাইনিং হলের দিকে পেছন ফিরে সে বিল মেটাচ্ছিল, তখন ওরা পাঠ অনুষ্ঠান থেকে ফিরে এল। তিনি কিছু একটা বলতেই সে তার গলা শুনতে পেল।

রিসিপশনিস্ট ফিস ফিস করে বেশ গর্বভরে বলল, ‘ঐ যে উনি সেই টি.। আমার স্ত্রী তার সব বই পড়েছে।’

সে পেছন দিকে ঘুরতে চাচ্ছিল, তবে পারল না। সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—কেবল হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো গুনতে লাগল।

গাড়িতে উঠেই তার নিজেকে হঠাত্ সম্পূর্ণ নিঃশেষিত মনে হলো। তার মনে হলো তার ওজন প্রায় এক টন হয়ে গেছে, এমনকি ঘোড়াটাও মনে হয় একইরকম অনুভব করছিল—সে মোটেই নড়তে চাইছিল না।

অনেকক্ষণ সে নীরব থাকায় গাড়ির চালক জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাবেন ম্যাডাম?’

সে বলল, ‘স্টেশনের দিকে।’

অ্যালেনস্টেইনের মতো শহরগুলোতে সবকিছুর শুরু এবং শেষ স্টেশনেই হওয়া উচিত।

[জেনিফার ক্রফ্ট-এর ইংরেজি অনুবাদের ভাষান্তর, অনুবাদ কাজী আখতারউদ্দিন]