সম্পদ বড়ুয়ার ‘কত দেশ কত গল্প ’

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৫৩

 ‘কত দেশ কত গল্প’ (২০১৮) সম্পদ বড়ুয়ার একটি অসাধারণ অনূদিত গল্পের বই। সম্পদ বড়ুয়া একজন খ্যাতিমান কবি, অনুবাদক ও গল্পকার। দশজন ভিন্ন ভিন্ন লেখকের এগারোটি গল্প নিয়ে লেখক এ গ্রন্থটি সাজিয়েছেন।

সাকির ‘ষাঁড়’, মুলক রাজ আননদ’র ‘জন্ম’ এবং ‘রুপার চুড়ি’, আলবার্তো মোরাভিয়ার ‘শিশু’, অমৃতা প্রীতমের ‘দীর্ঘশ্বাস’, নাদিন গর্ডিমারের ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘নিদ্রালু সুন্দরী এবং এরোপ্লেন’, চন্দ্রকান্ত কেনির ‘হিপ্পি মেয়েটি’, হারুকি মুরাকামির ‘বেকারিতে দ্বিতীয় হামলা’, চন্দ্রিকা বালানের ‘একটি কবিতার গল্প’, ঝুমপা লাহিড়ীর ‘সেক্সি’—এই এগারোটি বিদেশি গল্পের অনুবাদ নিয়ে ‘কত দেশ কত গল্প’ বইটি বেঙ্গল পাবলিকেশন্স প্রকাশ করেছে। সবগুলো গল্পই সরল গদ্যে অনুবাদ করা। বিষয়বৈচিত্র্যে ভরা গল্পগুলো মনস্তাত্ত্বিক,  থ্রিলারধর্মী, মাতৃত্ব সম্পর্কিত কিংবা নারীবাদী। কোনোটিতে রয়েছে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র, আবার রয়েছে শ্রেণিবৈষম্য। নিখাদ ভালোবাসার আনন্দ-বেদনার সঙ্গে কিশোর উপযোগী গল্পও আছে এ গ্রন্থে। এসব গল্পের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের মিল খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই। এগারোটি গল্পের মধ্যে মিয়ানমারের গল্পকার সাকির ‘ষাঁড়’ গল্পটি একটি ষাঁড়কে নিয়ে লেখা, আলবার্তো মোরাভিয়ার ‘শিশু’, মার্কেজের ‘নিদ্রালু সুন্দরী এবং এরোপ্লেন’, হারুকি মোরাকামির ‘বেকারিতে দ্বিতীয় হামলা’ এবং চন্দ্রিকা বালানের ‘একটি কবিতার গল্প’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গল্প অনুবাদের মাধ্যমে লেখক বিশ্বসাহিত্যকে সহজেই বাংলাভাষীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

বিশ্বসাহিত্যের অপরূপ সৃষ্টিসম্ভার ও সেই সাহিত্য যে শত বিষয়-বৈচিত্র্যে অনাবিল তারই সুন্দর সংকলন এই বইটি। গল্পগুলোর মাঝে একধরনের টান আছে যা পড়তে গেলে গল্প প্রেমীরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

‘ষাঁড়’ গল্পটি একটি ষাঁড়কে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা। গল্পটি অ্যাশলে ও এডেলের মাধ্যমে শৈল্পিক হয়ে উঠেছে। অ্যাশলে পেশায় একজন চিত্রশিল্পী আর তারই প্রতিবেশী এডেল। অ্যাশলের শখ ছবি আঁকা আর এডেলের বাগান করা। বাগান নষ্ট করা একটি ষাঁড়কে কেন্দ্র করে এই দুজনের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তা নিয়েই গল্পটি এগিয়েছে।

‘শিশু’ গল্পটি একটি নবজাতককে নিয়ে লেখা। শিশু সন্তানটিকে নিয়ে এক দম্পতির সমস্যাও চিহ্নিত হয়েছে। শিশুটি জন্ম নিলে স্বামী সে শিশুটি রাখতে চায় না। তারা প্রথমে কাউকে দিয়ে দিতে চাইলেও পায় না। পরে বিভিন্ন কৌশলে শিশুটিকে ফেলে রাখার জন্য জায়গা খোঁজে। যতবারই চেষ্টা করে দুজনে ব্যর্থ হয়। অবশেষে তারা প্যাকেটে করে একটা গাড়ির মধ্যে রেখে দিয়ে চলে আসে। তারা যেন সন্তান জন্ম দিয়ে পাপ করেছে। চলে আসার পরে তাদের মায়া বেড়ে যায়। তখন আবার আনতে গেলে গাড়ির মালিক মহিলা বাচ্চাটাকে নিজের সন্তান বলে দাবি করে। এভাবেই দেখা যায় কেউ নিজের সন্তানকে ফেলে দেয় আবার কেউ অন্যের সন্তানকে নিজের করে নেয়।

‘নিদ্রালু সুন্দরী এবং এরোপ্লেন’ গল্পটিকে একইসঙ্গে প্রেম ও ভ্রমণকাহিনি বলা যায়। প্লেন ভ্রমণের সময় তুষারঝড়ের কারণে প্লেন ছাড়তে দেরি হয়। তখন গল্প কথকের সঙ্গে এক ডাচ সুন্দরী ভদ্রমহিলার পরিচয় হয়। প্রথম দেখায় প্রেম জাগলেও একটু মনোমালিন্য হয়। প্লেন ছাড়ার সময় এসে দেখে যে সেই মহিলা তার সিটের পাশের সিটে বসে আছে। ঘুমের সময় সুন্দরী যেন আরো বেশি কমনীয় হয়ে ওঠে। কথক ডাচ মহিলার জন্য নিজের আরাম বিসর্জন দিলেও ঘুম থেকে উঠে চলে যাওয়ার সময় ধন্যবাদসূচক বাক্যও উচ্চারণ করে না নারীটি। তখন তার মনে হয়, ‘আমি কেন বৃষ রাশির ষাঁড় হয়ে জন্মালাম না।’

‘হিপ্পি মেয়েটি’ গল্পে দেখানো হয়েছে নারী ও পুরুষের মনকে ধর্ম ও সমাজের কাছে আবদ্ধ থাকতে হয়। ভারতীয়দের সঙ্গে ইউরোপীয়দের চিন্তা, দর্শন, ভাবনার যে পার্থক্য সে কথাই গল্পকার সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের নায়ক একজন ভারতীয় বিবাহিত। আর নায়িকা ফ্রান্স থেকে আসা এক আশ্রয়হীন অল্পবয়সী সুন্দরী সিনড্রেলা। আকস্মিকভাবে তাদের পরিচয়। পরে প্রেম, প্রণয় ও মিলন। সিনড্রেলা নায়ককে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, পুরুষের মন এক নারীতে আবদ্ধ থাকা ঠিক না। আবার ভারতীয় পুরুষ এটা মানে যে তারা স্ত্রীকে ছাড়া আর কাউকে সিঁদুর পরাতে পারে না। সিনড্রেলা নায়ককে প্রণয়ের জালে আবদ্ধ করে এবং মিলিত হওয়ার জন্য নেশা করায়। সিনড্রেলার গর্ভে সন্তান আসে এবং অবৈধ সন্তান হিসেবে পালন করার আশ্বাস দেয় সে। কিন্তু নিঃসন্তান ভারতীয় তার স্ত্রীর মন ভেঙে দিয়ে আসতে চায় না। এভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পকার ইউরোপীয় নারী ও ভারতীয় পুরুষের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

‘বেকারিতে দ্বিতীয় হামলা’ জাপানি লেখকের এ গল্পে নব বিবাহিত দম্পতির কাহিনি চিত্রিত হয়েছে। তাদের বিয়ে হওয়ার পর থেকে অস্বাভাবিকভাবে ক্ষুধা বেড়ে যায়। তারা যতই খেতে থাকে মনে হয় আরো খাওয়া দরকার। গভীর রাতে তারা খাবার না বানিয়ে বেকারিতে যায়, রেস্টুরেন্টে যায়। অনেক রাতে বেকারি খোলা থাকে না। এতই ক্ষুধা লাগে যে তারা বেকারিতে হামলা করে। মূলত ক্ষুধা থাকলে মানুষ যে অনেক কিছুই করতে পারে তা গল্পকার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

‘একটি কবিতার গল্প’-তে গল্পকার কবিতার উপকরণ, কবিতা কেমন করে মানুষের মনের রাজ্যে আসে এবং কবিতার মাধ্যমে মানুষের মন কী বলতে চায় তা কবিতা রচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

মূলত ‘কত দেশ কত গল্প’ সম্পদ বড়ুয়ার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদগ্রন্থ। সহজ-সরল ভাষায় ও সাবলীল গদ্যে বিশ্বসাহিত্যকে সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন তিনি। আশা করি তিনি সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্যের বিচিত্রধারার আরো বেশকিছু গল্প-উপন্যাস-কবিতা বাংলা ভাষায় উপহার দিতে সক্ষম হবেন। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য।

 

 

কত দেশ কত গল্প

সম্পদ বড়ুয়া

প্রকাশক :বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৮

প্রচ্ছদ :নিঝর্র নৈঃশব্দ্য

দাম :৩৬০ টাকা