নোবেল পুরস্কার কী এবং কেন?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ২০:২৩

নোবেল পুরস্কার পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক এবং মূল্যবান একটি পুরস্কার। মানবকল্যাণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সকল ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান সেরা অবদান রাখেন, তাদেরকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

এই পুরস্কারটির নামকরণ আলফ্রেড নোবেলের নামে করা হয়েছে। তিনি উইল করে একটি তহবিল রেখে যান, যেখান থেকে প্রতি বছর রসায়ন, পদার্থ এবং চিকিত্সাবিজ্ঞানসহ শান্তি এবং সাহিত্যে যারা সেরা অবদান রাখেন, তাদেরকে পুরস্কার দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৮ সালে অর্থনীতিতেও নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়।

এই পুরস্কারের প্রবর্তক, আলফ্রেড নোবেলের জীবনকাহিনিও অত্যন্ত চমকপ্রদ। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, আবিষ্কারক, রসায়নবিদ, প্রকৌশলী এবং জনহিতৈষী ব্যক্তি। ১৮৩৩ সালে স্টকহোমে তার জন্ম। তার বাবাও ছিলেন একজন প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবক। ছোটবেলা থেকেই প্রকৌশলবিদ্যা বিশেষত বিস্ফোরকদ্রব্য নির্মাণের প্রতি আলফ্রেডের আগ্রহ ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না পেলেও আবিষ্কারের প্রতি আগ্রহের কারণে ষোল বছর বয়সেই তিনি একজন দক্ষ রসায়নবিদ হয়ে ওঠেন। ফ্রান্স এবং আমেরিকায় রসায়ন নিয়ে পড়াশোনার পর বিস্ফোরক তৈরির পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়ে স্টকহোমে ছোট একটি কারখানা স্থাপন করেন।

সেসময় বিস্ফোরক হিসেবে নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহূত হতো, তবে তা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক ছিল। তবে বাণিজ্যিকভাবে কীভাবে এটা ব্যবহার করা যায়, তার একটি উপায় বের করার জন্য আলফ্রেড সচেষ্ট হলেন। তিনি এর সঙ্গে কিসেলগর বা ডায়েটমাইট নামে একধরনের মিহি খনিজ পাউডার মিশিয়ে নিরাপদ এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য একটি নতুন বিস্ফোরক আবিষ্কার করে এর নাম দিলেন ‘ডিনামাইট’। ১৮৬৭ সালে তিনি ডিনামাইটের প্যাটেন্ট করলেন। বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, খনি কোম্পানি এবং বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিনামাইটের অর্ডার এল, কেননা তুলনামূলকভাবে এটা বেশ নিরাপদ এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৫ সালে তিনি জেলিগনাইট আবিষ্কার করেন, যা ডিনামাইটের চেয়ে আরো শক্তিশালী। ডিনামাইট এবং অন্যান্য বিস্ফোরক বিক্রয় থেকে তিনি প্রচুর সম্পদ আহরণ করে একজন সম্পদশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন।

এমন সময় তার বড়ো ভাই হূদরোগে মারা গেলেন এবং ঘটনাক্রমে একটি ফরাসি পত্রিকায় ভুলবশত আলফ্রেড নোবেলেরই মৃত্যুসংবাদ প্রচার করল এবং তাকে ‘একজন মৃত্যুর সওদাগর’ হিসেবে অভিহিত করল। এটা দেখে আলফ্রেড মর্মাহত হলেন। তিনি তার আবিষ্কারের সম্ভাব্য অপব্যবহারের আশঙ্কাটি উপলব্ধি করলেন। ফলে মহত্ কিছু একটা করার কথা ভাবলেন। সে ভাবনা থেকেই মৃত্যুর আগে তার পুরো সম্পদের ৯৪% অংশ—প্রায় ৯০ লক্ষ ডলারের একটি তহবিল রেখে যান, যার লাভ থেকে ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া শুরু হয়। বিভিন্ন গুণীব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি যাচাই বাছাই করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেন এবং প্রতি বছর ১০ জানুয়ারি, আলফ্রেড নোবেলের জন্মবার্ষিকীতে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। উইলে আলফ্রেড নোবেল উল্লেখ করেছিলেন :‘... এটা আমার একান্ত ইচ্ছা যে, কারো জাতীয়তা বিবেচনায় না নিয়ে, যোগ্যতম ব্যক্তিকে যেন পুরস্কার দেওয়া হয়।’

পুরস্কারপ্রাপ্তদের একটি সোনার মেডেল, পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম এবং কৃতিত্বের  বিবরণসহ একটি সার্টিফিকেট এবং নগদ অর্থ দেওয়া হয়। মেডেলের এক পিঠে আলফ্রেড নোবেলের খোদাই করা আবক্ষ ছবি এবং উল্টোপিঠে ভিন্ন ছবিসহ লাতিন একটি বাক্য খোদাই করা থাকে, যার অর্থ ‘আবিষ্কার জীবনের শক্তি বাড়ায়, শিল্পকলার মাধ্যমে যা সুন্দর করা হয়।’