বাঘমারা নানা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ২০:২৫

শ্রাবণের শেষ বিকেল। আকাশে মেঘের পাহাড়। চারদিকে গমগমে বাতাস। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে একটি গামাইর গাছের নিচে একমনে বসে আছেন জামাল উদ্দিন। দুই দিন আগেও এখানে বাড়ি ছিল। নদে ভেঙে নিয়ে গেছে। উনানের পোড়া মাটি দেখা যাচ্ছে। বাঁশঝাড়ের একটা অংশ ভেঙে গেছে। পাশে গামাইর গাছটা আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গামাইরের ডালে হুড়োহুড়ি করছে নদের দমকা বাতাস। নদে মাতাল ঢেউ। জামাল উদ্দিনের মনের অবস্থাও আজ এরকমই। এত দিন হয়ে গেল আজো ভুলতে পারলেন না! নদের ওপর দিয়ে দূর দিগন্তে তাকিয়ে আছেন জামাল উদ্দিন—কেউ পালের নৌকা নিয়ে আসে কি না!

নদের পাড়ঘেঁষে মেঠোপথে হেঁটে আসছে শাওন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে। হাতে বইখাতা। জামাল উদ্দিনকে দেখে পাশে বসল। সম্পর্কে জামাল শাওনের নানা হয়। গ্রামে সম্পর্কটা বেশ মানা হয়। জামাল খুব জমিয়ে গল্প বলতে পারেন। তার গল্প শাওনের খুব পছন্দ। শাওন ডাক দিল, ‘কী খবর নানা?’ শাওনের ডাকে জামাল উদ্দিনের সম্বিত ফিরল। শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘একা একা বসে আছেন কেন? নদের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছেন?’ এ কথা শুনে জামাল উদ্দিনের মনে ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। চোখ দুটি ভিজে গেল। তিনি শুরু করলেন তার গল্প বলা :

‘এরকমই একদিন। আমার সাথে রাগ করে আমার ছোট ভাই কামাল বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। এই নদের ওপর দিয়েই নৌকা নিয়ে চলে গেল। আমিও রাগের মাথায় তাকে থামালাম না। সেই যে গেল আর ফিরে এল না! মানুষের অভিমান এত বড় হয় আমার জানা ছিল না! ভেবেছি রাগ কমলে ফিরে আসবে। কিন্তু কই, ফিরে আর এল না। ও চলে যাওয়ার পর মা কেমন যেন হয়ে গেল। রাতে ঘুমায় না। গাছের পাতা পড়ার শব্দ হলেও কামালের পায়ের আওয়াজ ভেবে দরজা খুলে ফেলে। কামাল, কামাল, ডেকে বাইরে বের হয়ে যায়। নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয়। আমার সঙ্গে রাগ করেই সে চলে গেল। অথচ, রাগ করার কারণও ছিল খুব সামান্য। তার শোকে শোকে মা মারা গেল। এখন আমার পালা। আমি ছাড়া তাকে স্মরণ করার আর কেউ নেই। আজ রাতে স্বপ্নে দেখি—কামাল পালের নৌকা নিয়ে বাড়িতে এসেছে। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। মাথায় সাদা পাগড়ি। মুখে সেই চেনা হাসি। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ভাই, ভালো আছ? তোমার টানে চলে এলাম।’ আমি আনন্দে আত্মহারা। কী যে ভালো লাগছিল! আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি দরজা খুলে বাইরে এলাম। চারদিকে রাতের নীরবতা। কোথাও কেউ নেই।’

শাওনের মনটা ভারী হয়ে গেল। ইচ্ছে ছিল জামাল উদ্দিনের কাছে তার বাঘ মারার গল্প শুনবে। কিন্তু এ অবস্থায় এ কথা বলাও যায় না। শাওন চলে আসবে বলে উঠে দাঁড়াল। জামাল উদ্দিন তাকে হাত ধরে বসালেন। বললেন, ‘বাড়িতে গিয়ে কী করবি? বস, গল্প করি।’ এবার সুযোগ পেয়ে শাওন বলল, ‘আপনাকে মানুষ বাঘমারা জামাল বলে কেন? সত্যি সত্যি কি বাঘ মেরেছিলেন?’ কথাটা শুনে জামাল হেসে বললেন, ‘মানুষ যে বাঘের সাথে লড়াই করতে পারে—এ বিষয়টা তোদের কল্পনাতেও নেই। তোদের সেই সাহসও নেই, শক্তিও নেই। আমাদের সেই সাহস এবং শক্তি দুটোই আছে। আমি বাঘ মেরেছি বেশিদিনের কথা নয়। আমার বয়স তখন ৪৫। শোন, তাহলে গল্পটা বলি :

‘আমার মামার বাড়ি বকশিগঞ্জে। একসময় সেখানে অনেক জঙ্গল ছিল। পাহাড় ছিল। মামাদের জমির ফসল মাঝে মাঝেই বুনো হাতি নষ্ট করে ফেলত। মামার বাড়ি বেড়াতে গেছি। বড় মামা বললেন, ‘চল, তিনকোনা খেতের ধান কেটে আনি।’ দুই পাহাড়ের মাঝে তিনকোনা একখণ্ড জমি। অধিকাংশ সময় বুনো জীবজন্তু এ জমির ফসল নষ্ট করে ফেলে। মামার কাজের লোক ছিল না। আমি গেলাম মামার সাথে। ধান কাটা প্রায় শেষ। মামা বললেন, ‘চল, নাস্তা খেয়ে আসি। আমি বললাম, ‘শেষ করেই যাই।’ মামা বললেন, ‘তাহলে তুই থাক। আমি তোর জন্য নাস্তা নিয়ে আসি।’ মামা চলে গেলেন। আমি ধান কাটছি। পেছন থেকে এক চিতাবাঘ আমাকে আক্রমণ করল। আমিও সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার হাতে ছিল কাঁচি। আমি কাঁচি দিয়ে আক্রমণ করলাম। বাঘের আছে শক্তি। আমার আছে শক্তি এবং বুদ্ধি। আমি লড়ছি জীবন বাঁচানোর জন্য। বাঘ লড়ছে তার খাবার জোটানের জন্য। অনেক ধস্তাধস্তি হলো। ইতিমধ্যে বাঘের খবর হয়ে গেছে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফিরলেই দেখি, আমি হাসপাতালের বিছানায়। পরে মামার কাছে শুনেছি—বাঘটা নাকি মরে পড়ে ছিল আমার পাশেই। তাই বলি—মনের জোর থাকলে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। আমি যদি ভাবতাম, আমার আর কী করার আছে। যা করার বাঘেই করবে। তাহলে বেটা বাঘ, আমার কলিজা চিবিয়ে খেত। আমি সাহস হারায়নি। পরাজয় মেনে নিইনি।