দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন

আধুনিক চিকিত্সার নেই কোনো ব্যবস্থা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৮

মুমূর্ষু রোগী নিয়ে নদীপথে জেলা সদরে পৌঁছাতে লেগে যায় ১২ ঘণ্টা। পাড়ি দিতে হয় ১০০ কিলোমিটার নদীপথ। সময় মতো লঞ্চঘাটে যেতে না পারলে ভরসা ট্রলার। দুর্যোগ ও বর্ষা মৌসুমে রোগীর চিকিত্সায় স্বজনদের ভোগান্তির শেষ থাকে না।

এ চিত্র সুন্দরবন সংলগ্ন উপজেলা কয়রার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের। শাকবাড়িয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া ও কপোতাক্ষ নদ ভয়াল জালের মতো ঘিরে রেখেছে এ ইউনিয়নটিকে। এখানে চিকিত্সা চলছে পুরনো পদ্ধতিতে। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে থাক, একটা ভালো ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি উপজেলা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে জায়গিরমহল গ্রামে।

দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের গোলখালী গ্রামের আ. রাজ্জাক (৪৭), রহিম মোল্যা (৬২) বলেন, ‘মুমূর্ষু রোগীদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে ভাগ্যের ওপর। ১০-১২ ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। আর স্থল পথে রোগী নেওয়ার কোনো উপায় নেই। কয়রা হাসপাতাল ৩২ কি. মি. দূরে। কয়রা উপজেলার এ জনপদে ২৫ হাজার মানুষ আধুনিক চিকিত্সাসেবা বঞ্চিত। ’

সরেজমিনে দেখা গেছে, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কাজ চলছে একটি ভবনে। পরিকল্পনা সেবা আর শিশুদের অসুখ-বিসুখ ছাড়া এখানে বিশেষ কোনো সেবার ব্যবস্থা নেই। ভবনে প্রবেশের আগেই মনে হবে এটা পরিত্যক্ত ভবন। কক্ষের ভেতরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নেই কোনো বিদ্যুেতর ব্যবস্থা। লবণাক্ততার গ্রাসে দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা।

কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার ডা. মানষ ঘোষ বলেন, ‘এখানে শিশুস্বাস্থ্য, মৌসুমি কিছু অসুখ, গর্ভবতী মায়েদের সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বিষয়ক কিছু সেবা দেওয়া হয়। জটিল সমস্যায় রোগীদের  উপজেলা ও জেলা সদরে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ওষুধ বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়।’

দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মেজাফফর হোসেন জানান, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জেনারেটর ও অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের ভালো চিকিত্সাসেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। চার জন লোকবল থাকার কথা থাকলেও একজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা রয়েছে। তিনি বর্তমানে প্রশিক্ষণে রয়েছেন। সপ্তাহে দুই দিন কোনো রকম চিকিত্সাসেবা দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মোড়ল, সফুরা খাতুন, আফজাল হোসেন জানান, এ এলাকার রোগীদের বাঁচাতে চিকিত্সার জন্য যেতে হয় জায়গীরমহল, জেলা শহর খুলনা, পার্শ্ববর্তী জেলা সাতক্ষীরা অথবা শ্যামনগরে। নিয়তির ওপর ভর করে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে চিকিত্সার জন্য ছুটতে হয়।

ঘড়িলাল এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে নেওয়ার সময় ভ্যানগাড়ি কিংবা যাত্রীবাহী লঞ্চেই সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটে। এ কাজে নিয়োজিত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নিয়োজিত আছেন ঠিকই, কিন্তু জটিল সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা তাদের কাছে নেই।’

দক্ষিণ বেদকাশি ইউপি চেয়ারম্যান জিএম শামছুর রহমান বলেন, ইউনিয়ন থেকে প্রতিদিন রাত ৯টার দিকে ১টি লঞ্চ জোড়শিং থেকে ছেড়ে যায় জেলা শহর খুলনার উদ্দেশ্যে। এরপর সারা দিন ও সারা রাতের মধ্যে যাতায়াতের  কোনো ব্যবস্থা নেই। মুমূর্ষু রোগীকে খুলনার যে কোনো হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় লাগে ১২ ঘণ্টারও বেশি। লঞ্চের সময় পেরিয়ে গেলে একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা অথবা ট্রলার।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘প্রত্যন্ত জনপদ হওয়ায় ঘড়িলাল বাজারে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করেছি। কোনো রকমে সেবা চালানো হচ্ছে।’