ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ৮ ধাপ এগোল বাংলাদেশ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৪৯

বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণের সূচকে আট ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘ডুয়িং বিজনেস-২০২০’ প্রতিবেদনের সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ১৬৮তম অবস্থানে। আগের বছরের সূচকে বাংলাদেশ ছিল ১৭৬তম অবস্থানে। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া, বিদ্যুত্ সংযোগ ও ঋণপ্রাপ্তি প্রক্রিয়া আগের চেয়ে সহজ হওয়ায় বাংলাদেশের এ অগ্রগতি। দক্ষিণ এশিয়ায় আগের বছর সবকটি দেশের পেছনে থাকলেও এবার আফগানিস্তানের ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে এবছর ভারত ১৪ ধাপ এগিয়ে ৬৩তম অবস্থানে, পাকিস্তান ২৮ ধাপ এগিয়ে ১০৮তম অবস্থানে, নেপাল ১৬ ধাপ এগিয়ে ৯৪তম অবস্থানে, শ্রীলঙ্কা ১ ধাপ এগিয়ে ৯৯তম অবস্থানে উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু আফগানিস্তান ছয় ধাপ পিছিয়ে ১৭৩তম অবস্থানে নেমেছে।

এ বছর ব্যবসা সহজীকরণের জন্য যে ২০টি দেশ সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি দেখিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেছে, মূলত তিনটি ধাপে বড়ো অগ্রগতি হওয়ায় বাংলাদেশ এগিয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো এবং ডিজিটাল সার্টিফিকেট ফি তুলে দেওয়ায় ব্যবসা শুরুর জন্য খরচ কমেছে। আগের বছরের তুলনায় বিদ্যুত্ সংযোগ আরো দ্রুত হয়েছে। তাছাড়া নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে জামানতের পরিমাণ কমানো হয়েছে। ঋণ গ্রহণের তথ্য পাওয়ার পদ্ধতি অনেক সহজ ও উন্নত হয়েছে।      এ বিষয়কে বাংলাদেশের ব্যবসা সহজীকরণে বড়ো অগ্রগতি বলেছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে এক প্রেস বার্তায় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়ং টিমবন উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা খুবই জরুরি। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিগত তিন বছরের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এতটুকু এগিয়েছে। কিন্তু সংস্কার কার্যক্রমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশ আরো এগিয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু আফগানিস্তানের ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। সংস্কারের অনেক বিষয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির প্রয়োগ সূচকে বাংলাদেশ ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৮৯তম অবস্থানে রয়েছে। সম্পদের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্পদ হস্তান্তর করতে বাংলাদেশে গড়ে ২৭১ দিন সময় লেগে যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে গড়ে ৪৭ দিনে করা সম্ভব হলেও ছয় গুণ বেশি সময় লাগছে বাংলাদেশের সম্পদ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি করতে স্থানীয় আদালতে সময় লাগছে গড়ে ১৪৪২ দিন। বিশ্বে অন্যান্য দেশে গড়ে ৫৯০ দিনে এর সমাধান হলেও বাংলাদেশে তিনগুণ সময় বেশি লাগছে। বাংলাদেশের একটি নতুন ভবনে বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৯টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এটি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর মাত্র দুটি দেশে এ ধরনের ৯টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

একটি দেশের ব্যবসা সহজীকরণে ১০টি মাপকাঠিতে তুলনা করে এই সূচক তৈরি করা হয়। এই ১০টি মাপকাঠি হলো—নতুন ব্যবসা শুরু করা, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি পাওয়া, বিদ্যুত্ সুবিধা, সম্পত্তির নিবন্ধন, ঋণ পাওয়ার সুযোগ, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তি বাস্তবায়ন ও দেউলিয়া হওয়ার সমাধানে। সব মিলিয়ে ১০০ ভিত্তিক এই সূচকে বাংলাদেশের মোট স্কোর হয়েছে ৪৫, যা গত বছর ৪১ দশমিক ৯৭ ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ মাপকাঠির মধ্যে ছয়টিতেই বাংলাদেশের স্কোর গতবারের চেয়ে বেড়েছে। এর মধ্যে ঋণ পাওয়ার সুযোগে স্কোর বেড়েছে ২০ শতাংশ পয়েন্ট। চারটি মাপকাঠিতে এবারের স্কোর গতবারের সমান। শুধু অবনতি হয়েছে দেউলিয়া হওয়া ব্যবসার উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে। কর প্রদানের সূচকে বাংলাদেশ রয়েছে ১৫১তম অবস্থানে। এছাড়া সম্পত্তি নিবন্ধনের সূচকে ১৮৪তম, সীমান্তের ওপারে বৈদেশিক বাণিজ্যের সূচকে ১৭৬তম অবস্থানে, চুক্তির বাস্তবায়ন সূচকে ১৮৯তম এবং দেউলিয়া হবার সমাধানে ১৫৪তম অবস্থানে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে বিডার সংবাদ সম্মেলন

‘ডুইং বিজনেস ২০২০’ প্রকাশনা উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। আরো বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমান, এসডিজির প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক ও অর্থ সচিব মো. আবদুর রউফ তালুকদার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান এফ রহমান বলেন, এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানে উন্নতির প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বেশি দিন হয়নি। তারপরও আমাদের প্রত্যাশা আরো বেশি ছিল। কারণ, আমরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক পরিবর্তন এনেছি। তবে এই পরিবর্তনের সুফল মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি যায়নি। আমরা এখন এই পরিবর্তনের প্রায়োগিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছি।

অন্য দেশগুলোর অবস্থা

সূচকে এবারে শীর্ষ স্থানে আছে নিউজিল্যান্ড। সূচকে তাদের স্কোর ৮৬.৮। দ্বিতীয় স্থানে আছে সিঙ্গাপুর এবং তৃতীয়তে হংকং। শীর্ষ ১০-এ থাকা অন্য দেশগুলো হলো, ডেনমার্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জর্জিয়া, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও সুইডেন। গতবারের মতো এবারও সোমালিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। আফ্রিকার এই দেশটির স্কোর মাত্র ২০। সবচেয়ে খারাপ অবস্থার দেশগুলোর তালিকার তলানিতে আরো রয়েছে—ইরিত্রিয়া, ভেনেজুয়েলা, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো ও সাদ। দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে ভারত।