ব্রিটিশরাজ সাবেক উপনিবেশগুলোর সর্বত্র যেসব ঔপনিবেশিক টাইমবোমা রেখে গেছে, সেগুলোর মধ্যে দীর্ঘতম মেয়াদের আসন দখল করে আছে কাশ্মীর। বয়সের বিচারে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষের চেয়ে কয়েক মাসের জ্যেষ্ঠ। (জানেন যে মিউনিক চুক্তির মাধ্যমে চেকোস্লোভাকিয়াকে জার্মানদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর ভাগ্যের অভিজ্ঞতা উপনিবেশগুলোকে বহন করতে হয়েছিল)। কাশ্মীর-বিবাদ দশকের পর দশক ধরে বিদ্যমান একটি বিষাক্ত সংকট। কাশ্মীর বিবাদ আবারও দুই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী ভারত ও পাকিস্তানকে অসংযত সংঘর্ষের পথে ঠেলে দিতে উদ্যত হয়েছে।
কাশ্মীর-বিবাদকে বোঝার জন্য ইতিহাসের শরণাপন্ন হতে হবে। আমাদের খুব দূর অতীতে যেতে হবে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তির পর ১৯৪৭ সালে প্রতিশ্রুতিমতো ব্রিটিশরাজ ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার সময় তারা উপমহাদেশকে বিভক্ত করে—ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় এবং অত্যন্ত অযত্নের সঙ্গে, বিশৃঙ্খলভাবে স্থানীয় রাজ্যগুলোর ভাগবাঁটোয়ারার ব্যবস্থা করে চলে যায়। কাশ্মীর/জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ছিল রাজ্যগুলোর একটি। বিভক্ত উপমহাদেশে কাশ্মীরকে ভিত্তি করে দুই দেশের মধ্যে হিংস্র্র বিবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ১৯৪৭-১৯৪৮ সালে কাশ্মীর যুদ্ধ নামে পরিচিত ইন্দো-পাকিস্তান প্রথম যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের পথে কাশ্মীর প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে অবস্থান করছে। ’৪৭-এর ‘পার্টিশন’ নামে পরিচিত—ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, রক্তাক্ত দাঙ্গাহাঙ্গামা ও লাখ লাখ মানুষের দেশান্তর ব্রিটিশরাজের ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির আনন্দকে কালিমাযুক্ত করে, মলিন করে দেয়। প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারায়। (ব্রিটিশরাজের হাত গুটিয়ে বসে থাকার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখেছি ১৯৪৮ সালে :ফিলিস্তিন-বিবাদের সূচনার বছরে। রক্তাক্ত দাঙ্গাহাঙ্গামা ও লাখ লাখ ফিলিস্তিনির দেশান্তর ঘটে)। স্থূল, ব্যস্ত গতির বিশৃঙ্খলতার মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্রান্তিকালে ব্রিটিশরাজের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং ক্ষমতা বজায় রাখতে এবং ক্ষমতায় সমাসীন থাকতে আগ্রহী বলে নিজেকে উপস্থাপন করেন। উপমহাদেশের পাট চুকিয়ে ব্রিটিশরাজের চলে যাওয়ার কারণস্বরূপ উপমহাদেশের স্থানীয় গভর্নরদের হাতে, ভারতে নাকি পাকিস্তানে যোগদান করবে—দায়িত্ব/সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। একমাত্র কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং বাদে বাকিরা সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই মতো ভারত বা পাকিস্তানের অংশে পরিণত হয়। আপাতদৃষ্টে অথবা প্রকৃত কারণ গোপন রেখে হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশের সঙ্গেই সংযুক্ত হন না এবং নিরপেক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মহারাজা সিংহাসনটি অক্ষুণ্ন রাখতে ইচ্ছুক বলে বিশ্বাস উত্পাদনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ৭৭ শতাংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের কাশ্মীরে অচিরেই সহিংস গেরিলা যুদ্ধের সূচনা হয় এবং প্রতিবেশী পাকিস্তানের মুসলিম বাহিনী সহায়-সাহায্য প্রদান করে। অতঃপর কাশ্মীরে পুরোদস্তুর যুদ্ধ বেধে গেলে হরি সিং ভারতের শরণাপন্ন হন এবং ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সই করতে রাজি হন এবং কার্যকরভাবে ক্ষমতার দাবি ছেড়ে দেন ও সরে যান।
কিন্তু সহিংসতাকে প্রতিহত করার জন্য ব্যবস্থাটি যথেষ্ট ছিল না। ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযোজন সাধনের পরপরই দুই পক্ষের সেনাবাহিনী বিতর্কিত বিবদমান ভূখণ্ড নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, প্রথম ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধ বেধে যায়। এই সংঘর্ষের সমাপ্তি ঘটে ‘নিয়ন্ত্রণরেখা/লাইন অব কন্ট্রোল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যদিও কোনো পক্ষই এই ‘লাইন অব কন্ট্রোল’কে চূড়ান্ত সমাধান বলে স্বীকার করে নেয়নি, তবে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ কিন্তু ডি ফ্যাক্টো পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত নির্দেশক। প্রাক্তন রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘রেফারেন্ডাম/গণভোট’ অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কিন্তু সেটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকায় গণভোট আর অনুষ্ঠিত হয়নি। কারণ ‘সেনামুক্ত/ডিমিলিটারাইজেশন’-সংক্রান্ত ক্রিয়াবিধি (প্রসিডিউর) ও সেনামুক্তির বিস্তারসংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রশ্নে দিল্লি ও ইসলামাবাদ একমত হতে ব্যর্থ হয়। কাশ্মীরি বিবাদে মহারাজা হরি সিংয়ের ভূমিকাকে উনজ্ঞান করার অবকাশ নেই বটে, তবে এই বিবাদের শিকড় এত সুদূরপ্রসারী যে একজনের পক্ষে ক্ষমতার খুঁটি ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেই আদি শিকড়ের সন্ধান করলে কেমন হয়?
১৮৪৬ সাল। ভারত ও পাকিস্তান নামক নতুন দুই দেশের আবির্ভাবের এবং কাশ্মীরের ওপর যুগপত্ অধিকার দাবির ১০১ বছর পূর্বের কাহিনিতে ফিরে দেখতে হয়। কাশ্মীরের শিখরাজ ব্রিটিশরাজের কাছে পরাজিত হন। ঔপনিবেশিক শাসক পরাজিত শিখরাজের সঙ্গে লাহোর শান্তি চুক্তি নামক শাস্তিমূলক চুক্তি সম্পাদন করে এবং পরাজিত শত্রুর কাছে ক্ষতিপূরণবাবদ ১৫ মিলিয়ন রুপি দাবি করে। কিন্তু এত বিশাল পরিমাণ অর্থ প্রদানের সামর্থ্য শিখদের ছিল না। অবশেষে উভয় পক্ষ সম্মত হয় যে শিখরা কাশ্মীরসহ কিছুটা ভূখণ্ডের অধিকার ব্রিটিশরাজের কাছে অর্পণ করবে। অবশ্য সদ্য দখলে পাওয়া ভূখণ্ডের ওপরে সরাসরি রাজত্ব করার কোনো ইচ্ছা উপনিবেশকারীদের ছিল না। তারা তাই তাবত বাসিন্দাসমেত নতুন ভূখণ্ডটি প্রতিবেশী রাজ্য জম্মুর মহারাজা গুলাব সিংয়ের (হরি সিংয়ের দাদার দাদা) কাছে সাড়ে সাত মিলিয়ন রুপির বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। অর্থের বিনিময়ে কাশ্মীরের স্বত্বাধিকারী গুলাব সিং প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেকে শিখরাজ্যের সেবায় নিয়োজিত করেন এবং শিখদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধেও শরিক হন। কিন্তু কালক্রমে উপনিবেশকারীদের সঙ্গে গুলাব সিংয়ের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরিণামে তিনি অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধে তার প্রাক্তন শিখ সার্বভৌমকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেন।
ব্রিটিশরাজের প্রতি এই সেবার বিনিময়ে গুলাব সিং যে উপহার পান, সেটিকেও তিনি কলঙ্কিত কলুষিত করেন। ব্রিটিশরাজের অধীনে গুলাব সিং নৃত্ত্বিক ও ধর্মীয় বহুমুখিতা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ কাশ্মীররাজ্যের স্বীকৃত শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন।
কাশ্মীররাজ্যের পূর্বে লাদাখে তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের বাস ছিল, দক্ষিণে প্রাক্তন রাজ্য জম্মুতে হিন্দু, মুসলমান ও শিখরা বসবাস করত, অপরদিকে সেন্ট্রাল কাশ্মীর উপত্যকায় মূলত মুসলমানরা এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ প্রভাবশালী হিন্দুরা বসবাস করত। ঔপনিবেশিকতা মোচনের কাল থেকে অনেকগুলো বছর পার হয়েছে। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বিতর্কিত ভূখণ্ডের স্বত্বাধিকার নিয়ে আরো দুটি যুদ্ধ করেছে এবং ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পরিণামে বিতর্কিত ভূখণ্ডের কিছুটা চীন নিজের দখলে নিয়ে নেয়। কাশ্মীরকেন্দ্রিক উত্তেজনায় অধিকাংশ সময়ে লন্ডন অংশ নেয় না, নিজেকে দূরে দূরে রাখে।
ভারতের সঙ্গে সংযোজিত হওয়ার পর থেকে কাশ্মীর যে ব্যাপক প্রশস্ত স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ভোগ করে আসছিল, সম্প্রতি নতুন দিল্লি সেটি প্রত্যাহার করলে অবিলম্বে আঞ্চলিক টেনশনের থার্মোমিটার বিপজ্জনকভাবে তীব্রতর হতে থাকে। অনেককাল হলো ব্রিটিশরাজ আর নেই। বিপর্যয় সৃষ্টির রেসিপি বা প্রস্তুতপ্রণালি তাদেরই ছিল বটে, কিন্তু কাশ্মীর-বিবাদের সমাধানে লন্ডনের আসলে কিছু করার অধিকার নেই। কারণ সম্পূর্ণ বিষয়টি নতুন দিল্লি ও ইসলামাবাদের আওতাধীন ও অভ্যন্তরীণ বিষয়। এতকাল হয়ে গেল, কাশ্মীর-বিবাদ অদ্যাবধি পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের ওপরে অপচ্ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
n লেখক :সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক