হায়দার আহমদ খান এফসিএ
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু করে ৯ মাস পর স্বাধীনতা লাভ করে। সময়ের পরিবর্তনে ২০১৯ সালে অর্থাত্ ৪৮ বছরের মাথায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি। বিশ্বের বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে ১৭ কোটি মানুষের প্রয়োজন যথেষ্ট রয়েছে বলা যায় যদি কাজ করতে পারে বা বাজার চাহিদা পূরণ করতে পারে। কারণ বিজ্ঞানের সবরকম যন্ত্রপাতি উত্পাদন এবং ব্যবহারের জন্য মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। সেটা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হলেও। তবে তখন মানুষকে হতে হবে যন্ত্র অপেক্ষা বেশি কর্মক্ষম অর্থাত্ জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষ মানবসম্পদ। এক কথায় বলা যায় সমাজ জ্ঞাননির্ভর হয়ে যাচ্ছে শতভাগ। কৃষিকাজেও বিজ্ঞানের ব্যবহার এখন অতি আবশ্যক।
সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ, একটি পত্রিকার জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা-ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ সম্মেলনে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় দিনে কান্ট্রি স্পিচে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ মানসম্মত শিক্ষায় সারা বিশ্বের রোলমডেল হতে চায়। এ লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় আরো সংস্কার আনতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।’ সংবাদ প্রকাশের পর বাংলাদেশের সব নাগরিকের মতো আমিও আশাবাদী। তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারের দীর্ঘদিনের অনেক চেষ্টার পরেও শিক্ষার হার আশানুরূপ হচ্ছে না, অনেকের মতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের অধিকাংশ মানুষের আর্থিক অসচ্ছলতা যা সন্তানের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগে বাধা।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখ দুপুর ১.৪৮ মিনিটে বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬,৯৭,২০,৬৬২ (www.countrymeters.info/en/Bangladesh)|এই ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় দুই কোটি প্রাথমিক শিক্ষার আওতায়। ২০১৭ সালে সরকারি হিসাব মতে মোট ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার ছেলেমেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে বা প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় এসেছে (সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮, সারণি ১২.৩৪)। একই সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১,৩৩,৯০১টি। সহজসরল হিসাবে বলা যায়, পাঁচটি শ্রেণিতে যদি মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১ কোটি ৭৩ লাখ হয় তাহলে এক শ্রেণিতে গড়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। চলতি বছরের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় ২৩ লাখ ৮২ হাজার ৭৯৪ জন ছেলেমেয়ে অংশ নিয়েছে। যদি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় তাহলে বলা যায়, ২০২২ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নেবে প্রায় ৩৫ লাখ ছেলেমেয়ে। অবশ্য এমন হিসাব কার্যকর হবে যদি ঝরেপড়ার হার শূন্য হয়। ঝরেপড়া বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে একটি সংবাদ উল্লেখ করা যায়। কিছুদিন আগের একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় ছিল ‘এত শিক্ষার্থী কেন ঝরিয়া পড়িতেছে?’ (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ২৪/০৫/২০১৭)। সংবাদে প্রকাশ, ২০১৩ সালের প্রাথমিক সমাপনীতে অংশ নেওয়ার তিন বছরের ব্যবধানে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সাড়ে ৫ লাখের মতো ছেলেমেয়ে। ঝরেপড়া বন্ধ করার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুদায়িত্ব সরকারের। সরকারের চেষ্টা এবং কাজের পর অর্জন অনেক—কিন্তু আবার এটাও সত্য, দেশের অনেক মানুষ এখনো সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বহনের মতো সক্ষম নয়। সন্তানকে শিক্ষিত করে সম্পদে রূপান্তর একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ যা বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ পারে না বা তাদের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না, বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায়।
সম্প্রতি অন্য এক সংবাদে প্রকাশ, বাংলাদেশে নবম ও দশম শ্রেণিতে গড়ে ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে। অন্য আর এক সংবাদে প্রকাশ, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের হার বাংলায় ৫৪%, ইংরেজিতে ১৯% এবং গণিতে ২২%। বাংলাদেশের ১ কোটির ওপর যুবক বিদেশে কর্মরত আছে খুব অল্প বেতনে। অল্প বেতন পাওয়ার একটি বড়ো কারণ মানসম্মত জ্ঞান, শিক্ষা না থাকা। দেশেও মানসম্মত মানবসম্পদের অভাব পরিলক্ষিত হয় যখন দেখা যায় বাংলাদেশের শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের একটি বড়ো অংশ বেকার আবার অন্যদিকে সংবাদ পাওয়া যায় অনেক বিদেশিরা বাংলাদেশে বেশ ভালো বেতনে চাকরি করছে।
শুনা যাচ্ছে, বাংলাদেশে অষ্টম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনা আসছে। আলোচনায় উঠে আসছে দক্ষ মানব সম্পদের প্রয়োজনীয়তা। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির সূচনা হয় সমাজের মায়েদের সুস্থতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে। আর সে কারণেই কাজ করতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত সন্তানের স্বাস্থ্যসম্মত মায়ের নিশ্চয়তার জন্য। সন্তানের আগমনের পর থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খাদ্য, চিকিত্সার নিশ্চয়তা প্রদান পরিকল্পনায় থাকতে হবে যেন কোনো অবস্থায় আমাদের সন্তানরা পুষ্টিহীনতায় না ভোগে। পল্লি এবং শহরভিত্তিক বর্তমান সমাজের সামাজিক বৈষম্য সহনশীল পর্যায়ে আনতে হবে। তারপর প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং পাঠদানের মান হতে হবে আদর্শ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। সমাজের সব স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই বাংলাদেশে মানসম্মত মানবসম্পদ পাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, স্বাধীনতা উত্তর ৪৮ বছরের মাথায়ও প্রায় অর্ধেক অর্থাত্ প্রায় ৮ কোটি মানুষের দৈনিক আয় ২০০ টাকার চেয়ে কম। সময় চলে যাচ্ছে পরিকল্পনা নিতে নিতে। অন্যদিকে বিশ্বের পরিবেশ দ্রুত বিজ্ঞান নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। মন্দেরভালো—যদি এখনো আমরা সুন্দর সমাজের জন্য সবাই মিলে কাজ করতে পারি মানবসম্পদ সৃষ্টির সব প্রয়াস শতভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। একটি দেশের সুন্দর সকালের জন্য ১০ বছরই যথেষ্ট। তবে শুরু করার পর বলতে পারব ১০ বছর শেষ কবে হবে।
n লেখক :চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন-ইডিএ