প্রাচীনকাল হইতেই নদীকে কেন্দ্র করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে সভ্যতা; জগতের সকল বিখ্যাত নগরী নদীতীরবর্তী। বাংলাদেশে প্রাচীন বাণিজ্যিক নগরগুলিও গড়িয়া উঠিয়াছে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে। পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক যাতায়াতের পথ ছিল এই নদীগুলি। তাহা ছাড়া নদীবাহিত পলি এই বদ্বীপকে করিয়াছে উর্বর। বাংলাদেশ বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, এইখানে নদীর পানি জোগান দিয়াছে সেচকাজের। আমাদের প্রাণ ও প্রকৃতির সহিত মিশিয়া আছে নদনদী; ইহার উপযোগিতা বলিয়া শেষ করা যাইবে না। সর্বশেষ নদীকে ঘোষণা করা হইয়াছে প্রকৃতির সপ্রাণ সত্তা হিসাবে; কিন্তু বাংলাদেশের সেই নদী হইয়া পড়িয়াছে বিপন্ন। এক সময় আট শতাধিক নদীর কথা শোনা গেলেও বর্তমানে কোনো মতে টিকিয়া আছে ৭১০টি। ইহার মধ্যে ৩০০ বড়ো নদী এবং ৪০০ শাখা নদী-উপনদী। ইহার মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক হিসাবে পরিচিত। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলির অবস্থাও সংকটাপন্ন। ফারাক্কা-গজলডোবাসহ নানা বাঁধ ও ব্যারাজে নদীগুলির স্বাভাবিক প্রবাহ অবরুদ্ধ প্রায়। ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ কমিয়া গিয়া হইয়াছে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার।
নদনদীর এই সংকটাপন্ন অবস্থার প্রধান একটি কারণ দীর্ঘদিন ধরিয়া চলমান ব্যাপক দখল-দূষণ। সারাদেশেই এই দখলদারী চালু আছে। এক সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, সারাদেশে ২১ হাজার দখলদারী রহিয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহার সহিত প্রধানত জড়িত স্থানীয় প্রতাপশালী মহল। কোনোভাবেই যেন তাহাদের নিরস্ত করা যাইতেছে না। দখলদারীর চক্রাকার বৃত্ত দেখিয়া আদালত পর্যন্ত মনঃক্ষুণ্ন হইয়া বলিয়াছেন—‘আজকে নদী দখল হইতেছে, কালকে হাইকোর্ট হইতে একটি অর্ডার দেওয়া হইতেছে, কয়েক দিন নিরিবিলি থাকিবার পর আবার দখল শুরু হইয়া যাইতেছে। এই কানামাছি খেলাটা বন্ধ হওয়া উচিত।’ আমরা মনে করি, নদীর দখল বন্ধ করিতে হইলে দখলকারীর পিছনের সমস্ত রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। আদালত এক রায়ে জানাইয়াছেন, যেই সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে নদী দখলের প্রমাণ রহিয়াছে, তাহারা কোনো নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করিতে পারিবেন না, এমনকি ব্যাংক হইতে ঋণও গ্রহণ করিতে পারিবেন না—ইহা বাস্তবায়ন করিতে হইবে। পাশাপাশি নদী রক্ষা কমিশনের ব্যাপারে ২০১৩ সালে যে আইন করা হইয়াছে, তাহাতে কমিশনের হাতে তেমন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয় নাই। কমিশন শুধু সুপারিশ করা ছাড়া কিছু বাস্তবায়ন করিতে পারে না। আমরা মনে করি, নদী রক্ষা কমিশনকে আরো শক্তিশালী করিতে হইবে। ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করিতে যে অভিযান পরিচালনা করা হইয়াছে, তাহা সারাদেশে সম্প্রসারণ করিতে হইবে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের দেশে নানাভাবে পড়িতেছে। একদিকে মরুকরণ বাড়িতেছে অপরদিকে লবণাক্ততা ছড়াইয়া পড়িতেছে উপকূলীয় অঞ্চলে। ইহা রোধে সারা বছর যাহাতে নদীর নাব্য ধরিয়া রাখা যায়, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলির পানিবণ্টন-ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আইনের অনুসারে হইতে হইবে। সুজলা সুফলা এই বদ্বীপের প্রাণ-প্রতিবেশ টিকাইয়া রাখিবার স্বার্থে আমাদের নদনদীগুলিকে পরিচর্যা করিতে হইবে।