গাইবান্ধায় চাঁন রাত (গত রবিবার ২৪ মে) ১১টা থেকে গত বুধবার (২৭ মে) গভীর রাত পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় তাণ্ডব চালিয়েছে কালবৈশাখী। ঝড়েছে ভাড়ি বৃষ্টিপাত আর শিলাবৃষ্টি। ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে প্রতিষ্ঠানসহ দুই শতাধিক কাঁচাপাকা ঘর-বাড়ি। ঝড়ো হাওয়ায় শুয়ে পড়েছে ধান গাছ। শিলাবৃষ্টিতে গাছ থেকে ঝড়ে পড়েছে পাকা ধান। ফলে মাঠের ধান ঘরে তুলতেই ঈদের দিনে ব্যস্ত ছিলেন জেলার গ্রামাঞ্চলের লোকজন। বিশেষ করে জেলার সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এই দৃশ্য দেখা গেছে বেশি।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবছর জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এখন এই ধান কাটার ভরা মৌসুম। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শতকরা ৯১ ভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। আরো ৯ ভাগ ধান অর্থাৎ ১১ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমির ধান কাটা অবশিষ্ট রয়েছে।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁন রাত (গত রোববার ২৪ মে) ১১টা থেকে গত বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত দফায় দফায় তাণ্ডর চালানো এই ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুরে লন্ডভন্ড হয়েছে দুই শতাধিক কাঁচাপাকা ঘর-বাড়ি। এরমধ্যে সুন্দরগঞ্জের শান্তিরাম, শ্রীপুর ও ছাপরহাটি ও সাদুল্লাপুরে বনগ্রাম, ভাতগ্রাম ও ইদিলপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। ওইসব এলাকায় অনেকের ঘরের ছাউনি গেছে উড়ে। পানিতে শুয়ে পড়েছে বোরো ধান। বেশকিছু মৌসুমী ফল আম, লিচু ও কলা বাগান গেছে দুমড়ে মুচড়ে। গাছপালা উপড়ে পড়ে অনেক জায়গায় যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের আহাজারি করতেও দেখা গেছে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির আঙ্গিনার খোলা আকাশের নিচে। এছাড়া ঈদের দিন এইসব এলাকার লোকজনদের পরিবার পরিজনসহ ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে মাঠের ধান ঘরে তুলতে। এদের কেউ ধান কাটছে। আবার কেউ ধান মাড়াই করছে। আবার কেউ ধান শুকাচ্ছেন।
সাদুল্লাপুরের তরফসাদুল্যা গ্রামের কৃষক অজিজুল ইসলাম জানান, গত রাতের ঝড়ো হাওয়ায় জমিতে জমা পানিতে ধান শুয়ে পড়েছে। তাই পেটের ভাত জোগাতে ঈদের দিন ধান কেটে মাড়াই করছি। তা না হলে প্রতিদিন রাতে যেভাবে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। শেষে এই টুকু ধানও ঘরে তুলতে পাব না।
একই উপজেলার কিশামত শেরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ (৫০) বলেন, ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে তার ৩ বিঘা জমির পাকা ধান গাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে ঈদের দিন ধান কাটা-মাড়াই করছি।
উপজেলার গঙ্গানারায়ণপুর (গাছুপাড়া) গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত আব্দুস ছাত্তার মিয়া বলেন, মঙ্গলবার রাতের কালবৈশাখীর ঝড়ের বাড়ির সবকটি ঘরে ভেঙ্গে চুরামার হয়েছে। ফলে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে। অথচও এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের লোকজন খোঁজ-খবর নিলো না।
একই উপজেলার বকসিগঞ্জ গ্রামের কৃষক তোফায়েল মিয়া (৫০) বলেন, কয়েকদিন আগে একবিঘা জমির ধান কেটেছি। অবশিষ্ট ধান কাটবো কাটবো বলে চিন্তা করছি। কিন্তু এরই মধ্যে শিলাবৃষ্টিতে আরও একবিঘা জমির বেশিরভাগ ধান নষ্ট হয়ে গেছে।
একই গ্রামের কৃষক সোলায়মান আলী (৫৫) বলেন, মঙ্গলবারের শিলাবৃষ্টিতে গাছ থেকে ধান ঝড়ে গেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া আর সম্ভব হবে না।
সুন্দরগঞ্জের ছাপড়হাটি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে তার লিচু ও কলা বাগান দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ায় এবছর উৎপাদন খরচ আর উঠবে না।
উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এটিএম রেজানুল ইসলাম বাবু জানান, ঝড়ে গঙ্গানারায়ণপুর (গাছুপাড়া) গ্রামের ২০টি পরিবারের ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড হয়েছে। এসব পরিবারের মানুষেরা এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। নতুন করে কীভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ করবেন, এনিয়ে তারা চিন্তায় পড়েছেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী লুতফুল হাসান বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে দেড় শতাধিক কাঁচাপাকা ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও গাছপালা উপড়ে গেছে ও বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাহারিয়া খান বিপ্লব জানান, মঙ্গলবার ও বুধবার রাতে উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় ও শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির শিকার মানুষরা আবেদন করলে, তাদের সহায়তা করা হয়ে।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে জেলায় দেড় হাজার বিঘা জমির পাকা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ধানের মধ্যে বিআর-২৯ ও বিআর-৫৮ জাতের ধানই বেশি।
ইত্তেফাক/আরকেজি