বিশেষজ্ঞমত

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যখন আসছে না

ঈদের কয়েকদিন আগে এক টিভি আলোচনায় একজন প্রস্তাব করেন- ঈদের আগে ও পরে পাঁচদিন করে ১০ দিন কারফিউ প্রদান করতে হবে। যুক্তি ছিল- মানুষকে যার যার স্থানে আবদ্ধ রাখতে পারলে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

করোনার সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের অনেকের এক সময় মনে হয়েছিল, আমরা এ বিপদ বোধ হয় পাশ কাটিয়ে যেতে পারব। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানার সময় ফেসবুকে কলিকাতার একাধিক লোক মন্তব্য করেছে এভাবে অতীতে যত বার বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সতর্কবার্তা এসেছে, মানুষ দেখেছে শেষ পর্যন্ত ঝাপটা সহ্য করেছে বাংলাদেশ বা উড়িষ্যা। কিংবা অন্ধ্র। কলিকাতা রক্ষা পেয়েছে। এবারেও সিটি অব জয়-এর অনেক মানুষ এমন ধারণা নিয়েই ছিলো। বাস্তবে সেটা ঘটেনি। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে দেখা গেছে অপ্রস্তুত অবস্থা। প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এমনকি রাজনৈতিক নেতৃত্ব অসহায়বোধ করেছে। সমন্বয়হীনতা প্রকটভাবে ধরা পড়েছে।

বাংলাদেশে করোনার প্রবল ঝুঁকির মধ্যেই কিন্তু বোরো ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। দুই কোটি টনের বেশি চাল এ মৌসুমে আমরা পেয়েছি। জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা সতর্কবার্তা জারি করেছে- অনেক দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হতে পারে। কোটি কোটি মানুষের খাদ্য মিলবে না। কিন্তু আমাদের অনেকের ঘরে ও সরকারি গুদামে চাল আছে। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। যারা চাল কিনে খায় তাদের মধ্যে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের সংখ্যা অনেক। তাদের হাতে অর্থ থাকতে হবে খাদ্য কেনার। কিংবা ত্রাণ দিতে হবে তাদের। কিন্তু কতজনকে ত্রাণ দিতে পারবেন? কতদিন ধরেই বা দিতে পারবেন? বাংলাদেশ জনবহুল। অর্থনৈতিক ক্ষমতা সীমিত। দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি আছে।

এর ওপর মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো করোনা ও আম্পান। কেউ দাবি করতেই পারে- করোনা থেকে রক্ষার জন্য মানুষকে অনির্দিষ্টকাল ঘরে রেখে দিতে হবে। কিন্তু উৎপাদনের চাকা সচল রাখা না গেলে খাদ্যে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সেটা কি ধরে রাখা যাবে? কৃষি খাত বিভিন্ন সময়ে বড় দুর্যোগের মধ্যেও ভাল করছে, এটা সবাই মানছেন। এ ভাল অবস্থা ধরে রাখার জন্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক, কৃষক ও কৃষি মজুররা যেন করোনা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে  কেউ বা অনেকে যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে যেন চিকিৎসা পেতে পারে। এমনকি তাদের যদি ভেন্টিলেশন-আইসিইউ সুবিধা দরকার হয়, যদি ৫০-৬০ হাজার টাকা ডোজের ওষুধ দরকার হয়, সেটাও যেন মেলে ভর্তুকি হিসেবে। দুই, কৃষি পণ্য বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা। এ জন্য এক স্থানের পণ্য অন্য স্থানে নিতে হবে। মাথায় বহন করে কত স্থানে আপনি চাল বা আলু কিংবা মাছ নিতে পরবেন? আপনার চাই যানবাহনের সহায়তা। বিশ্বের কোথাও কোথাও হয়ত বিলাসবহুল দামি গাড়ি আছে, যা চলতে পারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। চালক লাগে না। বাংলাদেশের ধান-চাল বা আম-লেবু অথবা মাছ বা সবজি-কলা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার জন্য কি এ ধরনের যানবাহনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব? অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাজার। কৃষি পণ্যের বাজার মানেই ভিড়-কোলাহল। নিরাপদ দূরত্ব এ ক্ষেত্রে বজায় রাখা কেবল কঠিন নয়, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের দূরত্ব বজায় রাখা আমাদের তুলনায় সহজ। সেখানে বিশেষ করে গ্রামের দিকে এমনিতেই মানুষের বসবাস অনেক দূরে। বাংলাদেশে শহর ও গ্রাম সর্বত্র লোক গিজ গিজ করে। কারফিউ দিলে ফুটপাতে বসবাসকারীদের জীবনের কী হবে?

তদুপরি আছে অভ্যাস, যা সহজে বদলানো যায় না। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া বা কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া ফেরি ঘাটে দেখা যায়, মানুষ গায়ে গায়ে দাঁড়ানো। ঢাকায় যখন পোশাক কারখানা খোলার সংবাদ আসে তখন মানুষ জীবীকার জন্য ছুটবে, এটা স্বাভাবিক। কেউ বলবেন, ফেরি সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হলেই তো সমস্যা থাকে না। কিন্তু চাইলেই ফেরি বাড়ানো যায়? এ জন্য বাড়তি ফেরি লাগে, ঘাট লাগে, কর্মী লাগে। করোনার মতো অতি মহামারীর জন্য কোনো দেশের সরকার প্রস্তুত ছিলো না। বাংলাদেশও প্রস্তুত নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সময়ের দাবি পূরণের জন্য আমরা কতটা সৃজনশীলতা প্রদর্শন করতে পারি? যার যেখানে দায়িত্ব সেখানে কতটা স্বকীয়তা দেখাতে পারি? উদ্যোগী হতে পারি? এক ডিজিটাল সংলাপে কয়েকজন বস্তিবাসীর আলোচনা শুনেছি। তারা বলেছেন, এক ঘরে কয়েকজন শ্রমিকের বসবাস। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান একসঙ্গে থাকে। পুরুষ ও নারী শ্রমিকরা মেস করে থাকে। পাশাপাশি অনেক মেস। কিংবা বস্তি ঘর। তাহলে উপায়? কয়েকজন শ্রমিক প্রস্তাব দিয়েছেন এভাবে- বস্তিতে বা মেস পাড়ায় একটু দূরের কোনো ঘরকে করোনা সন্দেহজনকদের থাকার জন্য আলাদা করে রাখা সম্ভব। স্কুল ঘর পেলে সেটাও এ জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক খুলে দেওয়া হয়েছে। ১০০ ভাগ কর্মীকেই অফিসে প্রয়োজন? আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে যারা কাজ করতে পারেন, তাদের কেন ওয়ার্ক অ্যাট হোম সুবিধা দেওয়া হবে না? এতে সড়কে যানবাহনের ওপর চাপ কমবে। এ সিদ্ধান্ত গভর্নর নিজেই নিতে পারেন।

আমাদের রফতানি বাণিজ্য পোশাক শিল্প নির্ভর। প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার রফতানি হয়, যার আশি শতাংশ আসে পোশাক থেকে। পোশাক যা রফতানি হয়, তার কাপড়ের জোগান আসে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে। চীনে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। চীনের বস্ত্র রফতানি কারকরা ভয় পায়- বাংলাদেশ যদি সে দেশ থেকে পোশাক কারখানার বস্ত্র আমদানি কমিয়ে দেয়? কিংবা বন্ধ করে দেয়? যদি ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়া থেকে বস্ত্র আমদানি বাড়িয়ে দেয়? ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এ আশঙ্কা থেকে দ্রুত তৎপর হন। তিনি বাংলাদেশের মন্ত্রী-সচিবদের কাছে দেন দরবার শুরু করেন যেন এমন ‘আত্মঘাতী’ উদ্যোগ নেওয়া না হয়। অন্যদিকে, ভারতের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা বলছে- বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে ভারতে রফতানি করছে। চুক্তি থাকায় বাংলাদেশের পোশাক ভারতে রফতানি হয় শুল্ক ছাড়াই। এ কারণে পোশাকের দাম কম থাকছে। একটি তৈরি পোশাকের মূল্যে বড় অংশই বস্ত্রের দাম। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ভারতে যে পোশাক রফতানি করছে তার শুল্ক সুবিধার বড় অংশ ভোগ করছে চীন। কেন চীনকে এ সুবিধা প্রদান করবে ভারত?
চীন-ভারত রেষারেষি কিন্তু বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে। সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই সতর্ক রয়েছেন।

মহাবিপদের মধ্যেই পদ্মা সেতুর সাড়ে চার কিলোমিটার দৃশ্যমান। এ অর্জন অভাবনীয়। পদ্মায় চালু ফেরিতে মানুষের ভিড় দেখে আমরা অনেকেই উদ্বিগ্ন হই। ঢাকায় ফিরে এসে এ সব লোক আমাদের করোনায় আক্রান্ত করে ফেলবে নাতো? ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়ে তারা করোনা ছড়িয়ে আসেনি তো? পদ্মায় মাথা তুলেছে বাঙালির বড় গর্বের একটি প্রকল্প, যা চালু হলে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। এই যে এত সব অস্বাভাবিকতার মধ্যেও আমরা বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে পড়ছি না, তার মূলে বিদ্যুৎ নিয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত- উৎপাদন বাড়াতে হবে। কয়েক বছর আগে একটি বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম- বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানা বন্ধ, শ্রমিকরা তাস খেলছে। এখন কিন্তু এ চিত্র নেই। মালিকরা বলে না- বিদ্যুৎ নেই, কারখানা বন্ধ।

পোশাক শিল্পের রফতানি কমার শঙ্কা প্রকাশ করছিলেন মালিকরা। এখন অনেকেই বলছেন- নতুন ধরনের পণ্যের প্রচুর অর্ডার মিলতে পারে। যেমন পিপিই, মাস্ক। এ জন্য কর্মীদের বাড়তি প্রশিক্ষণেরও খুব দরকার পড়বে না। ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে। কেবল কারখানার শ্রমিকরা নয়, এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক-বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ সেবা খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান। আরও রয়েছে পরিবহন ও বন্দর। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের খাদ্য-স্বাস্থ্য সুবিধা এ সবও গুরুত্বপূর্ণ। পুরোটাই একটা চেইনের মতো। উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বিশ্ব যে লকডাউন বা সাধারণ ছুটি শিথিল করার  বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্তে এসেছে, তা আকস্মিক নয়। ঝুঁকি নিয়েছে বিশ্ব। আমরা ঝুঁকি না নিয়ে যদি কমপ্লিট শাটডাউন করে অপেক্ষা করি, তাহলে কি নিরাপত্তা নিশ্চিত?

আমরা অবশ্যই আত্মঘাতী হবো না। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে- সুযোগ যেন হাতছাড়া না করি। রফতানি বাণিজ্যে যদি নতুন নতুন পিপিই পোশাকের অর্ডার আসতে থাকে তাহলে কি আমরা ফিরিয়ে দেব? না-কি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে তা উৎপাদন ও জাহাজে তুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নেব? জীবন ও জীবীকার মধ্যে কোনটি বেছে নেব, সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু জীবন রক্ষা করেই জীবিকা সচল রাখা সম্ভব হলে সে পথ থেকে সরে আসার অবকাশ নেই।

জার্মানির হ্যামিলনের বাসিন্দারা মরণব্যাধি রাগ থেকে বাঁচতে বাঁশিওয়ালাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বাঁশি বাজিয়ে রোগের বাহক ইঁদুর তাড়িয়েছিলেন। কিন্তু সে বিপদ ছিল একটি এলাকার। এখন করোনার বিপদ গোটা বিশ্বে। গত ছয় মাসেও কোনো অঞ্চল বা দেশ থেকে করোনা দূর করার জন্য কোনো বাঁশিওয়ালার সন্ধান মেলেনি। ভ্যাকসিন দু-চার মাসে আসবে, এমনটা অতি আশাবাদীরাও বলছেন না। রোগটি শরীরে বাসা বাঁধলে ওষুধ কী খেতে হবে, সে বিষয়েও নানা মত। কতটা সুলভ, সে প্রশ্নও আছে। এ চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের, এ চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে সব দেশের। রাষ্ট্রনায়কোচিত ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আমাদের অবশ্যই পথ দেখাবে, এ ভরসা করতেই পারি।

ইত্তেফাক/আরএ