রেমডেসিভির এখন পর্যন্ত একমাত্র ওষুধ যা করোনা চিকিত্সায় ব্যবহারের জন্য এফডিএ কর্তৃক অনুমোদন পেয়েছে। এফডিএ সাধারণত একটি ওষুধের অনুমতি দিতে কমপক্ষে ৮-১০ বছর সময় নেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এবং কোনো ভ্যাকসিন এখনো পর্যন্ত প্রস্তুত না থাকায় জরুরিভিত্তিতে রেমডেসিভির অনুমোদন দিতে বাধ্য হয়েছে তারা। রেমডেসিভির নামক এন্টিভাইরাল ওষুধটি সর্বপ্রথম ২০০৯ সালে হেপাটাইটিস-সি-এর চিকিত্সায় ব্যবহূত হয়েছিল। কিন্তু হেপাটাইটিস-সি চিকিত্সায় ওষুধটি আশানুরূপ ফল পায়নি। ২০১৪ সালে কঙ্গোতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে রেমডেসিভির দ্বিতীয়বারের মতো মানবদেহে পরীক্ষা করা হয়। রেমডেসিভির ইবোলা আক্রান্ত রোগীদের শরীরে কোনো মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেনি কিন্তু এর কার্যকারিতা সীমিত ছিল।
গত এপ্রিল মাসে ‘ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা’র গবেষকরা জানান, রেমডেসিভির করোনা ভাইরাসের বংশবিস্তার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে সক্ষম যা ‘জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল কেমেস্ট্রি’ নামক গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তারা বলেন, রেমডেসিভির ভাইরাসের জিনগত উপাদানের বংশবিস্তারের জন্য দায়ী এনজাইম ‘পলিমারেজ’কে প্রতিহত করে। পলিমারেজ ভাইরাসের জিনোম তৈরিতে সাহায্য করে। করোনা ভাইরাসের পলিমারেজকে ব্লক করলে সেটি দেহে আর ছড়াতে বা বংশবিস্তার করতে পারে না। গবেষকরা গত ফেব্রুয়ারিতে ঐ একই গবেষণাপত্রে বানরের দেহে ‘মার্স’ ভাইরাসের বিরুদ্ধে রেমডেসিভির কার্যকারিতা প্রমাণসহ উপস্থাপন করেন। এনিমাল টেস্টে ‘মার্স’ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সফল পরীক্ষার পর গবেষকরা ওষুধটি হিউম্যান ট্রায়ালে পরীক্ষার ব্যাপারে উত্সাহী হয়ে ওঠেন। যেহেতু মার্সের মতো কোভিড-১৯ও একটি রাইবো-নিউক্লিক এসিড করোনা ভাইরাস।
চীন সর্বপ্রথম ১৫৮ জন করোনা রোগীর ওপর রেমডেসিভির ওষুধের হিউম্যান ট্রায়াল পরিচালনা করে। তাদের গবেষণায় ওষুধটির কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তাদের গবেষণায় যথেষ্ট তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি ছিল, তাই সেই ট্রায়ালটি গুরুত্ব হারায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘গিলিয়াড সাইন্স’ আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়াতে প্রায় ৭ হাজার রোগীর ওপর দুটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্যা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ’ গত ২৯ এপ্রিল রেমডেসিভিরের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্যউপাত্ত উপস্থাপন করেন।
এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি ১ হাজার ৬০ জন রোগীর ওপর করা হয় এবং রোগীদেরকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি গ্রুপকে রেমডেসিভির দেওয়া হয়েছিল এবং আরেকটি গ্রুপকে প্লাসেবো দেওয়া হয়েছিল যার কোনো চিকিত্সা গুণাগুণ নেই বা রোগের বিরুদ্ধে দেহে কোনো কার্যকরী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। এই গবেষণায় উঠে আসে যারা রেমডেসিভির গ্রহণ করেছিলেন তারা ১১ দিনে সেরে উঠেছেন। আর যাদের প্লাসেবো দেওয়া হয়েছিল তাদের আরোগ্য লাভ করতে ১৫ দিন সময় লেগেছে।
রেমডেসিভির প্রয়োগে করোনা রোগীরা তুলনামূলক দ্রুত আরোগ্য লাভ করলেও মৃত্যুহার কমাতে সক্ষম হয়নি। তাই বর্তমানে রেমডেসিভিরের সঙ্গে এন্টিবায়োটিক, ইমিউনো সাপ্রেসেন্ট ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং আরো কী কী কম্বিনেশন থেরাপি ব্যবহার করলে সুফল মিলবে সেটার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়