তবে কি ব্যাংকঋণ ফেরত না দেওয়াই উত্তম?

দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার শৃঙ্খলা লইয়া নানান কথা প্রচলিত রহিয়াছে। অনেকেই বলিয়া থাকেন—ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব রহিয়াছে। কাহারো মতে, কিছুসংখ্যক লোকের দৌরাত্ম্য না কমাইলে কোনো শাসনই কাজে আসিবে না। তাহারা আইনকানুনের ধার ধারেন না। তাহাদের সম্পর্কে কেহ কেহ রঙ্গরস করিয়াও বলিয়া থাকেন যে, ব্যাংক হইতে ঋণ লইবার পর তাহারা মনেপ্রাণে শপথ করেন যে, ‘তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হইবে না, না না না’..। এই শ্রেণির লোকদের উদ্দেশ্যই থাকে ব্যাংক হইতে ঋণ লইয়া ফেরত না দেওয়া। তাহারা সংখ্যায় বেশি না হইলেও টাকার অঙ্কে বা পরিমাণগত দিক হইতে তাহাদের নিকটই ব্যাংকের অনেক টাকা পাওনা। তাহারা প্রভাবশালী তো বটেই, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও বোধকরি তাহাদের রহিয়াছে। যদি নাই-বা থাকিত, তাহা হইলে কম টাকার খেলাপি গ্রাহকদের ব্যাংক কর্তৃক হেনস্থা হইবার অমন সংবাদ চোখে পড়িত না। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ একটি নির্দেশনা দেখিয়া বদ্ধমূল ধারণা হইল যে, যাহারা কষ্টেসৃষ্টে ব্যাংকের ঋণ ফেরত দিয়া আসিতেছেন, তাহাদের প্রতি নয়, বরঞ্চ যাহারা টাকা ফেরত না দিয়া দিব্যি রহিয়াছেন, তাহাদের প্রতিই বাংলাদেশ ব্যাংকের তথা নীতিনির্ধারকদের যত সহানুভূতি।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনায় বলিয়াছে, ব্যাংকের ভালো ঋণগ্রহীতাদের ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা দেওয়া যাইবে না। তবে ভালো গ্রাহক চিহ্নিত করিবার কাজ চালাইয়া যাইতে হইবে এবং তাহাদের কাহারো ছবি ব্যাংক ইচ্ছা করিলে বুকলেট তথা প্রচারপত্রে ছাপাইতে পারিবে। ইহার মানে একজন ভালো গ্রাহক নিয়মিত ব্যাংকের কিস্তি শোধ করিবার পর তাহার পাওনা হইল একটি ছবি প্রকাশ। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যেখানে একজন ভালো গ্রাহক পুরস্কার পাইবার কথা—সেখানে সুদের আয় হইতে মাত্র ১০ শতাংশ রিবেট হইতেও তাহাকে বঞ্চিত করা হইল। এইখানে বলিয়া রাখা ভালো যে, বরাবরই ভালো গ্রাহকদের জন্য কোনো সুবিধা ব্যাংকিং খাতে ছিল না। বরং যাহারা খেলাপি হইয়াছেন তাহারা সুদ মওকুফ হইতে শুরু করিয়া সময় বর্ধিতকরণসহ নানান সুবিধা পাইয়া আসিতেছেন। তাহার পরও টাকা ফেরত না দিবার ফন্দিফিকির খুঁজিয়া বেড়ান। বিষয়টি তুলিয়া ধরিয়া দৈনিক ইত্তেফাকই প্রথম ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল তারিখে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। যাহার শিরোনাম ছিল—“যৌক্তিক ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ভালো গ্রাহকদের জন্য শুধুই ‘থ্যাংক ইউ’!” ইহার পর কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়িয়া উঠে। একই বত্সরের ১৬ মে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় যে, নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করা তথা ভালো গ্রাহকরা বত্সর শেষে ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা পাইবেন। ব্যাংকগুলি যে পরিমাণ আয় করিয়া থাকে, এই ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা তাহার তুলনায় অতি সামান্য। ইহা অনেকের মতন আমাদেরও আশ্বস্ত করিয়াছিল। যদিও অধিকাংশ ব্যাংকই নানান ফাঁকফোকরে গ্রাহকদের এই সুবিধা সেইভাবে দেয় নাই। তথাপি একটা স্বীকৃতি, কিছুটা প্রাপ্তির কারণে ভালো গ্রাহকদের মনে সন্তুষ্টিও ছিল; কিন্তু অদৃশ্য কারণে এই সামান্য সুবিধাটিও প্রত্যাহার করা হইয়াছে। অথচ করোনাকালে যাহারা ঋণের কিস্তি দিয়া যাইতেছে, তাহাদের আরো বেশি প্রণোদনা দেওয়া উচিত; কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগের ফলে ভালো গ্রহীতারা ঋণ ফেরতে নিরুত্সাহিত হইবেন—ইহা কিন্তু মন্দঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকের খাতের জন্য মোটেই সুখকর নহে। এখন ভালো গ্রাহকরাও ভাবিতে পারেন—ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দেওয়াই বুঝি উত্তম হইবে!

হঠাত্ এই সিদ্ধান্ত কেন? বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তি দেখাইয়াছে যে, সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বাস্তবায়ন করায় ঐ সুবিধার প্রয়োজন নাই। তাহা হইলে প্রশ্ন থাকিয়া যায় যে, সিঙ্গেল ডিজিট সুদ সুবিধায় ব্যাংকের ঋণখেলাপি হইবে না এমন গ্যারান্টি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রহিয়াছে কি? নানান চার্জে নাকাল গ্রাহকদের কার্যকরী সুদহার কি ৯ শতাংশেই রহিয়াছে? বলা হইয়াছে, সরল সুদহার হইবে এবং ব্যাংকগুলি কোনোভাবেই ৯ শতাংশের বেশি সুদ গণনা করিতে পারিবে না। বাস্তবে কি তাহা হইতেছে? ইত্যাকার এই সকল প্রশ্নের জবাব কি বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কিংবা নীতিনির্ধারকদের নিকট রহিয়াছে? নাকি কিছুসংখ্যক ‘দুষ্টচক্রে’র ঘেরাটোপে আটকাইয়া গিয়াছে আমাদের ব্যাংকিং খাত? নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাহারা আশেপাশে ঘুরিয়া এই সকল পরামর্শ দিয়া যাইতেছেন—তাহাদের অতীত রেকর্ড কি কেউ ঘাঁটিয়া দেখিয়াছেন? এই সকল প্রশ্নের উত্তর না খুঁজিলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করিবে না। যুগে যুগে দুষ্ট লোকদের ভুল পরামর্শ নীতিনির্ধারকদের জনতার কোপানলে নিপতিত করিয়াছে, তাহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না।