শিক্ষানীতি ২০২০: আজকের ভারতের জন্য একটি শিক্ষানীতি

ভারতে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন তরুণ রয়েছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের কম। এই জনসংখ্যার প্রতি অর্থনৈতিক ও শিক্ষামূলক আকাঙ্ক্ষার ফলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংস্কার হচ্ছে। ২০২০ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকার ‘নতুন শিক্ষানীতি ২০২০ (এনইপি ২০২০)’ ঘোষণা করে। নীতিটি ভারতের জন্য একটি দূরদর্শী শিক্ষাকাঠামো তৈরি করে এবং তরুণদের শিক্ষাগত চাহিদা পূরণ করে। এটি সর্বস্তরে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেছে।

অল্পবয়সে শিক্ষাজীবন শুরু এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ

ভারতের স্কুলশিক্ষা লিনিয়ার পদ্ধতির পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটা একটা ১০+২ সিস্টেম যেখানে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগে ১০ বছরের বিদ্যালয় শিক্ষা এবং দুই বছর উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। এনইপি ২০২০ বিদ্যালয় শিক্ষাকে চার ভাগে বিভক্ত করেছে, বুনিয়াদি (পাঁচ বছর), প্রস্তুতিমূলক (তিন বছর), অন্তর্বর্তী বিদ্যালয় (তিন বছর) এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় (চার বছর)।

আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় শিক্ষা এখন তিন বছর বয়স থেকে শুরু হবে। তবে এই স্তরের শিক্ষাটি মূলত খেলাধুলা/ ক্রিড়াকলাপভিত্তিক। পরবর্তী প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে শিক্ষা অব্যাহত থাকবে, তবে বিজ্ঞান, মানবিক, গণিত ইত্যাদি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেয়া হবে। বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যক্রমের সাথে শিক্ষকের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা প্রক্রিয়া হবে পরবর্তী পর্যায়ে অন্তর্বর্তী বিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য। মাধ্যমিক বিদ্যালয়-শিক্ষা শিক্ষার্থীর মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা জাগ্রত করবে, শিক্ষার গভীরতা বাড়িয়ে তুলবে এবং বিষয় নির্বাচনে আরও নমনীয়তার সুযোগ দেবে।

নীতিটি শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মুখস্তবিদ্যা থেকে দূরে সরিয়ে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বোর্ড পরীক্ষাগুলো ‘সহজ’ করা হবে এবং শিক্ষার্থীর ‘মূল দক্ষতা’ যাচাইয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম আরও সামগ্রিক, পরীক্ষণ ও আবিষ্কারভিত্তিক এবং বিশ্লেষণমূলক শিক্ষাকে উত্সাহিত করে এমনভাবে সাজানো হবে। ইন্টার্নশিপ এবং কারিগরি শিক্ষা যা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করবে অন্তর্বর্তী বিদ্যালয় থেকে শুরু হবে।

নমনীয় ও বহুমুখী উচ্চশিক্ষা

এনইপি ২০২০ ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায়ও ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। এটি স্নাতক কোর্সকে তিন বছর বা চার বছর মেয়াদে অনুমোদন দিচ্ছে। এটি একাধিক প্রবেশ এবং প্রস্থান বিকল্প সরবরাহ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে। সহজ কথায় বলতে গেলে, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যে কোনও বছরে কোর্স ছেড়ে যেতে পারে। এক বছর শেষে একটি প্রশংসাপত্র, দুই বছর পরে চলে গেলে একটি ডিপ্লোমা এবং পুরো মেয়াদ শেষ করলে ডিগ্রি পাবে। এটি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান বিকল্পের উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জনে সহায়তা করবে।

উচ্চতর শিক্ষার এই নমনীয়তাটি পরিকল্পিত ডিজিটাল ‘একাডেমিক ব্যাংক অফ ক্রেডিট’ দ্বারা সমর্থিত। শিক্ষার্থীদের দ্বারা অর্জিত একাডেমিক ক্রেডিটের এই ডিজিটাল স্টোরটি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর সহজ করবে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা পুনরায় শুরু করার সুযোগ দেবে। এটি যুব-সমাজকে শিক্ষা এবং কাজ দুটোই নির্বিঘ্নে সম্পাদন করতে দেবে।

নীতিটি শিক্ষার ক্ষেত্রে বহুবিভাগীয় (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এটি সুপারিশ করে যে সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি বহুবিভাগীয় হওয়া উচিত। এটি একটি সময়োপযোগী পরিবর্তন। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউটস অব টেকনোলজির মত শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ মানবিক বিভাগ চালু করে বাজারের চাহিদা পূরণ করে চলেছে। জননীতি, পরিবেশ, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে কোর্স আজকের প্রকৌশলীদের জন্য প্রয়োজনীয় কারণ তারা তাদের প্রকল্প, ব্যবসা এবং স্টার্ট-আপ ইত্যাদির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত।

এনইপি ২০২০ ভারতে শীর্ষ ১০০টি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের পথও প্রশস্ত করেছে। নতুন শিক্ষানীতির অধীনে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের বিনিময় বৃদ্ধি পাবে, যা সন্দেহাতীতভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে গতিশীলতার সূচনা করবে। শীর্ষস্থানীয় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান যুক্ত হবে এবং শিক্ষার মান বাড়িয়ে তুলবে।

শিক্ষায় শক্তিকেন্দ্র হিসেবে ভারত

এনইপি ২০২০-এর লক্ষ্য ভারতকে একটি প্রাণবন্ত জ্ঞান সমাজে রূপান্তর করা। এটি তরুণদের তাদের মানসম্পন্ন শিক্ষায় প্রবেশাধিকার দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করে যা তাদের প্রয়োজন এবং শেখার আগ্রহের পক্ষেও নমনীয়। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্জিত ক্রেডিটের সহজ স্থানান্তরের ফলে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ভারতের শিক্ষা-ব্যবস্থায় সহজে প্রবেশাধিকার পাবে। ভারত তার জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার ফলে শিক্ষার অবকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। শিক্ষাক্ষেত্রে একটি শক্তিকেন্দ্র হিসেবে ভারতের বিকাশ পুরো অঞ্চলের জন্য সুসংবাদ।

বলা বাহুল্য, স্বল্প-ব্যয়ে মানসম্মত শিক্ষা সবখানেই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত। ভারতে ইতোমধ্যে অসংখ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিচ্ছে। সংস্কারযোগ্য শিক্ষা খাত নিয়ে ভারত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা সরবরাহকারী হিসেবে আরও বড় ভূমিকা পালন করবে।

লেখক: ভারতীয় হাই কমিশন, ঢাকার রাজনৈতিক ও জনকূটনীতি বিষয়ক কর্মকর্তা