নদীগর্ভে বিলীন ঠেকাতে একের পর এক নিলাম হচ্ছে স্কুলভবন!

রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে ৩৭ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত লক্ষীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। ১৯৮৭ সালে ৩৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটি রবিবার নিলাম দেওয়া হয়েছে মাত্র আড়াই লাখ টাকায়। এ নিয়ে গত ৮ বছরে ৫ টি বিদ্যালয় নিলাম দেওয়া হয়েছে।   

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়টি ১৯৯৮ সালে ৩৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একতলা এবং ২০১১ সালে ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দোতলা সম্পূর্ণ করা হয়। দীর্ঘ ৩৭ বছর যাবত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানো এই বিদ্যালয়টি এ বছর পদ্মার ভাঙনে নদী গর্ভের কাছাকাছি  চলে আসে। তাই কোন উপায় না পেয়ে বিদ্যালয়টির নির্মাণ সামগ্রী ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন স্থানীয় প্রশাসন।  

এদিকে ঠিকানা হারানো বিদ্যালয়টি এখন কোথায় নিয়ে যাবে, সেই চিন্তায় পড়েছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি। 
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবর রহমান জানান, চোখের সামনে বিদ্যালয়টি পদ্মায় তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম লক্ষ করে নিলাম দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না। 

শুধু ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, গত ৮ বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, ৫টি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের ছিল অনেক মধুর স্মৃতি। পদ্মা নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন বাঘা উপজেলার অবিভক্ত চকরাজাপুর ইউনিয়ন। দুর্গম ওই চরের চারদিকে পদ্মা নদী। 

চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, ১৯৩৫ সাল থেকে দুর্গম পদ্মা চরের মধ্যে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, ৯টি প্রাথমিক ও দু’টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এরমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, চকরাজাপুর, পলাশি ফতেপুর, ফতেপুর পলাশি, লক্ষ্ণীনগর, চকরাজাপুর, পশ্চিম চরকালিদাস খালী, পূর্বচকরাজাপুর। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে চকরাজাপুর ও পলাশি ফতেপুর। 

এর মধ্যে ১৯৩৫ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত পলাশি ফতেপুর ও দ্বিতীয়টি ১৯৫৫ সালে চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালের পরবর্তী সময়ে চকরাজাপুরসহ অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৯৭৮ সালে চকরাজাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও পরে পলাশিফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। 

২০০৫ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরবর্তী সময়ে ভাঙনের কবলে পড়ে ঠিকানা হারায় পলাশিফতেপুর, আতারপাড়া, চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়। তবে এ বছর চরকালিদাসখালী, লক্ষীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় ঠিকানা হারালো। 

চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার জানান, প্রথমে ১৯৯৮ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে বিদ্যালয় ও চকরাজাপুর বাজার। সে বছর সরিয়ে নেওয়ার পর ২০১২ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে ওই বিদ্যালয় ও বাজার। পরে পুনরায় কালিদাশখালী মৌজায় সরিয়ে নেওয়ার পর ২০১৮ সালে আবারো ভাঙনের কবলে পড়ে বিদ্যালয়ের পাঁকা ভবন ও বাজার। 

আরও পড়ুন: নতুন প্রজন্মের কাছে গৌরবের ইতিহাস তুলে ধরবে ‘ভালোবাসা প্রীতিলতা’: তথ্যমন্ত্রী 

২০০০ সালে উপজেলার মনিগ্রাম ইউনিয়নের মীরগঞ্জ, পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর গোকুলপুর, কিশোরপুর পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। তার পর থেকেই প্রতি বছর ভাঙতে থাকে পদ্মার পাড়। যা এখন অবধি চলমান। 

স্থানীয় লোকজন জানান, ২০০৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন কবলিত জায়গাগুলোতে বালির বস্তা দিয়ে তা ঠেকানোর পর ২০০৫ সালে উদয়নগর বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ক্যাম্পসহ চৌমাদিয়া গ্রামটি রক্ষার জন্য ব্লক বসায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। সে ব্লক বসানোর কয়েকদিন পর সেগুলো নদীতে ভেসে যায়।

এ বিষয়ে চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল আযম জানান, গত তিন দশকে ভাঙনের কবলে পড়ে নদীতে বিলীন হয়ে যায় হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, বসত ভিটা, রাস্তা-ঘাট, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদসহ কবরস্থান। ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে সর্বহারা হয়েছে প্রায় হাজার হাজার পরিবার। এই সব পরিবারের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। এদের অনেকেই বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণ করে নতুন ভাবে বসবাস করছেন। 
 
পাকুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মেরাজুল ইসলাম মেরাজ জানান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপির সার্বিক সহযোগিতায় ৭২২ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হবে। এ কাজ শুরু হলে ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে পদ্মা পাড়ের মানুষ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকায় গত বছর থেকে কিছু স্থানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে রক্ষা করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে এর সমাধান আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

ইত্তেফাক/এএএম