চোখের সামনে মাকে খুন হতে দেখে শিশু ফারিয়া

পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু ফারিয়া নিজের চোখের সামনেই দেখে তার মাকে খুন হতে। আর খুনটি করেন তার বাবা কাওসার গাজী। মায়ের খুনের সঙ্গে বাবাকে জড়িয়ে আদালতে দেন জবানবন্দি।

কিন্তু তার নানা জলিল দুয়ারী আদালতে এফিডেভিট দিয়ে বলেছেন, তার জামাতা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। কুচক্রী মহলের ইন্ধনে তিনি ঐ মামলা দায়ের করেছেন। বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আসে। তখন হাইকোর্ট উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ইদানীং প্রায়শই লক্ষ্য করছি বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় বাদী মিথ্যা তথ্য দিয়ে আসামিদের জামিন করানোর প্রয়াস করছেন। এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য মামলার বাদী জলিলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পটুয়াখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই আদেশ দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশিরউল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, এই মামলায় ছোট্ট শিশুর জবানবন্দি রয়েছে। আছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও। যেখানে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এর পরেও নিহতের বাবা মামলার বাদী বলছেন ঘটনা সত্য নয়। তিনি বলেন, বাদী যখন এফিডেভিট দিয়ে বলেন যে আসামি জড়িত নন, তখন মামলার ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমেয়।

প্রসঙ্গত, পটুয়াখালী পৌরসভার টাউন বহালগাছিয়া এলাকার বাসিন্দা স্বামী কাওসার গাজীর বাড়িতে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর খুন হন স্ত্রী সাথী আক্তার। পর দিন এ ঘটনায় পটুয়াখালী থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আত্মহত্যা নয়, আঘাতের ফলে সাথীর মৃত্যু হয়েছে। এর পর ২০১৯ সালের ১২ মার্চ সাথীর বাবা জলিল দুয়ারী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ মামলায় ঐ বছরের ১৮ মার্চ প্রধান সাক্ষী নিহত সাথীর পাঁচ বছরের কন্যা ফারিয়া আফরোজ কাশমি আদালতে জবানবন্দি দেন। সেখানে শিশুটি বলে, ‘ঘটনার সময় আমি মায়ের সঙ্গে ছিলাম। আমার আব্বু কাওসার গাজী লাঠি দিয়ে আম্মুর মাথায় বাড়ি দেয়। আব্বু পরে আম্মুর গলায় রশি দিয়া ফাঁসি দেয়। এই ঘটনার পূর্বে আমার আব্বু ও আম্মুর সঙ্গে ছাদে ধানের বস্তা উঠানো নিয়া ঝগড়া হয়।’ নিষ্পাপ শিশুর জবানবন্দির পর ঐ বছরের ২৯ জুলাই আদালতে এফিডেভিট দেন মামলার বাদী।

ঐ এফিডেভিটে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে সাথী তার জামাইকে ভুল বুঝে এবং তার সঙ্গে রাগান্বিত হয়ে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে এবং অন্যের দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে ঘরের দরজা আটকে গলায় রশি দিয়া আত্মহত্যা করে। ঐ আত্মহত্যায় আমার জামাতা কিংবা তার বাবা-মা জড়িত নয়। আমি পরবর্তী সময়ে কিছু কুচক্রী লোকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মামলা করি। যা আদৌ সত্য নয়। আমার মেয়ের জামাই দুটি নাবালক সন্তানের পিতা। উক্ত সন্তানদের ভবিষ্যতে দেখাশুনার জন্য এই মামলা পরিচালনার আবশ্যকতা নেই। আসামিরা মামলা থেকে অব্যাহতি পেলে আমার আপত্তি নেই।’

গতকাল মামলার আসামি কাওসার গাজীর জামিন শুনানিকালে এ সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আসে। তখন আদালত উষ্মা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আসামির জামিন মঞ্জুর করে আদালত।

এ প্রসঙ্গে বাদী জলিল দুয়ারী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি তো দেখিনি আমার মেয়ে কীভাবে মারা গেছে। থানার দারোগা আমাকে বলেছে সেজন্য এজাহার দায়ের করেছি। পরে উকিলের কথামতো এফিডেভিট দিয়েছি আসামিদের অব্যাহতি দিতে।’