যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন সংক্রান্ত অবাঞ্ছিত অন্যায় আবদারই মূলত যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন। দেশে সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা ‘যৌন নিগ্রহের শিকার পরীমণি’। পুরুষতান্ত্রিক দূষিত সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণত মেয়েরাই বেশি যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের স্বীকার হয়ে থাকে। ঘটনা যা-ই ঘটুক না কেন, পুরুষকে ছাপিয়ে নারীকেই দোষারোপ করা হয়। কলঙ্ক লেপে দেওয়ায় হয় নির্দোষ নারীর ললাটে।
যেকোনো মেয়ের অসম্মতির বিরুদ্ধে যৌন আবেদনই যৌন হয়রানী, এটাই অনেক লম্পট পুরুষরা বুঝতে চায় না। জোরপূর্বক তাদের পৌরুষ জাহির করতে চায়। নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী কোনো না কোনো সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ জীবনের যেকোনো সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দেশে প্রতিনিয়তই যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। একের পর এক ধর্ষণ, যৌন আক্রমণ এবং নিপীড়নের ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত।
নারীরা দেশের অগ্রযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেদের মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলেও গুটি কয়েক পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির কারণে নারীরা সেভাবে এগোতে পারছেনা। এইসব বিকৃতমনা পুরুষগুলো নারী দেহের বিভিন্ন গঠনের উপর সর্বদা দৃষ্টি রাখে এবং কখন তাকে নিজ আয়ত্তে আনতে পারবে সে চিন্তা করে। তারা এতটাই মানসিক বিকারগ্রস্ত যে, যার উপর দৃষ্টি দিচ্ছে তার বয়স কত, সে শিশু না বৃদ্ধা না যুবতী কোনটাই চিন্তা করে না। তাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে শুধু নারীরাই নয়, পুরুষদেরও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, প্রতিটি নারী-ই কারো মা, কারো বোন আবার কারো মেয়ে। তাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
১.যখনই কোনো পুরুষ নারীকে ধর্ষণ করারা কোনো অপচেষ্টা করে, তখনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সে যেই হোক না কেন, প্রতিবাদ করতে হবে। অনেক পুরুষের মনেই নারীকে পণ্য করে দেখার প্রবণতা আছে। সেটা সুপ্ত থাকে। সময় সুযোগ পেলে তার নোংরা লোলুপ পশুটাকে বের করে নিয়ে আসে। তাই অনৈতিকভাবে নারীকে ভোগ করার সুপ্ত আকাক্ষাগ্রস্থ পুরুষদের কড়া ভাষায় না বলতে হবে। নারীদের উৎসাহিত করতে হবে ভয় থেকে বেরিয়ে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দিতে।
২.পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষদেরই আধিপত্য সব কিছুতে। মেয়েদের মূল্যায়নটা তুলনামূলক কম হয়, তাদের প্রতি অনীহা, অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য-এসব ধর্ষণ বাড়ার অন্যতম কারণ। অনেক সময় ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। আবার যৌন সহিংসতা প্রসঙ্গ আসলে নারীর পোশাক, শারীরিক গঠন, তার চালচলন এসব অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তাকে অযথায়ই দোষারোপ কারা হয়।
৩.সবকিছু পুরুষের চোখ দিয়ে দেখা যাবে না। নারীর ক্ষমতায়নকে কাগজে কলমে না রেখে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বত্র নারীকে নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সময় এসেছে পুরুষকে নিজের মূল্যায়ন করার। পুরুষদের উপলব্ধি করতে হবে নারীরও ইচ্ছে-অনিচ্ছা আছে।
৪.কোনা নারী ধর্ষিত হলেই তাকে নিয়ে গালগল্প তৈরি করে পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ। সে কেমন পোশাক পরেছিল? কেন গিয়েছিল? কার সাথে গিয়েছিল? কি কি করছিল?-এমন হাজার প্রশ্নে তাকে জর্জরিত করে ধর্ষণের পর। এসব করা বন্ধ করতে হবে। কিভাবে, কোন উপায়ে তাকে ধর্ষণ করেছিল এমন ভয়ংকর প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হয় ধর্ষিতা নারীকে।
৫.যৌন হয়রানী ও সহিংসতা বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব থাকতে হবে। আইন প্রণেতাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে যাতে ধর্ষণকারী কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়। এবং যৌন নিপীড়ন সম্পর্কে নারীর অজ্ঞতা এবং এর আইন সম্পর্কে না জানার কারণেই নির্যাতিত হয়েও যে প্রতিকার পাচ্ছে না, সেটা সম্পর্কেও সম্যক ধারণা রাখতে হবে।
৬.চলমান ধর্ষণ সংস্কৃতির নোংরা বলয় থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক পুরুষই রাতে একা কোনো নারীকে পেলে তার সম্ভ্রবহানী ঘটাতে চায়। তার এই ধর্ষণ করার অসুস্থ মানসিকতা বর্জন করতে হবে। অন্যদিকে অহরহ বাল্য বিয়ের মাধ্যমেও ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের ধর্ষণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সেটা রোধ করতে হবে।
৭.নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় অবস্থা, তার শিক্ষা, সংস্কৃতি, বয়স- এসব কিছুই ধর্ষণের নেপথ্যের কারণ হিসেবে বিবেচ্য করতে হবে। নারীকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনের পথে চলতে হয়। অনেক সময় তাদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে ধর্ষণ করা হয়। মানবিক সংকটগুলোতে পাশে না থেকে বরং বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে নারীকে।
৮.ইতিহাসে ধর্ষণ যুদ্ধ ও নিপীড়নের অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। অনেক সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্তি, জাতিগত ও ধর্মীয় দাঙ্গায় নারীকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি আধুনিক এই সময়ে এসেও পুরুষরা নারীকে দুর্বল ভেবে নিজেকে শক্তিমান হিসেবে জাহির করতে ধর্ষণ করে যাচ্ছে।
৯.নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো সহিংসতার বন্ধ করতে হবে। তাদের ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে এবং কাজকে স্বীকৃতি দিতে হবে। লিঙ্গ পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে তাদের অবস্থানকে দৃঢ় করতে হবে সমাজ তথা রাষ্ট্রে। নারীর দীপ্ত কণ্ঠের সোচ্চার হওয়া কথাগুলো শুনতে হবে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজকে।
১০.ধর্ষিত নারীকে ভরসা দিতে হবে। তাকে বলতে হবে, আপনি বা আপনারা তার পাশে আছেন। নির্যাতনের কথাগুলো শর্ত ছাড়াই বিশ্বাস করুন। এ সময় নারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরে। তাদের সেসব নারীদের গল্প শোনান, যারা ধর্ষিত হয়েও জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।
১১.ধর্ষণ কোনো মজার বিষয় নয়। এটা নিয়ে হাসিতামাশা করবেন না। ধর্ষিতার পাশে দাঁড়ান। তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন না। তার হয়ে কথা বলুন। ধর্ষককে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে বয়কট করুন। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলুন। ছোট্ট থেকেই মেয়েদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হবে। তাদের সুরক্ষার জন্য কী কী করণীয় এবং যৌন সহিংসতা থেকে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পারে তা জানাতে হবে। লিঙ্গ সমতার বিষয়েও সম্যক ধারণা দিতে হবে তাদের।
১২.বিশ্বব্যাপী তিনজন নারীর মধ্যে একজন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারীর প্রতি যেকোনো নির্যাতন বা ধর্ষণ যে গ্রহণযোগ্য নয় এটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানাতে হবে। নারীর অসম্মতিতে তার সাথে কোনো কিছু করা যাবে না, তাদের সম্মান করতে হবে এটা ছোট থেকেই ছেলেদের বুঝাতে হবে। কারণ, নারীর সঠিক নিরাপত্তার সাথে সামাজিক মূল্যবোধ জড়িত।
১৩. কোনো নারীক যদি কোথাও নির্যাতনের শিকার হতে দেখা যায় তাহলে পুরুষদের এগিয়ে আসার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ভয়ে পালিয়ে যাওয়া চলবে না। ভুলে গেলে হবে না, এই ভাবে চুপ থাকতে থাকতে একদিন ধর্ষক আপনার ঘরে ঢুকে পরবে। তাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।
১৪.ধর্ষণ যে কাপুরুষের কাজ, ধর্ষণ যে নোংরা মানসিকতার লোলুপ ব্যক্তির অন্যায় আচরণ-এসব পরিবারের সবার সাথে শেয়ার করতে হবে। ধর্মীয়ভাবেও যে এটা অন্যায় এবং ক্ষমার অযোগ্য এসব সন্তান, ভাইবোন, বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতে হবে। কোনো নারীর অসম্মতিতে তার দৈহিক গঠন নিয়ে কটূক্তি বা স্পর্শ করাই যে যৌন হয়রানীর মধ্যে পড়ে এ বিষয়টাও জানাতে হবে।
১৫.যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন বিষয়ক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। মিডিয়াগুলোতে এর প্রচার বাড়াতে হবে। বিভিন্ন পেশায় যৌন নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে ‘মিট’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় যে ক্যাম্পেইন চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, সকলের উচিত হবে এর প্রচারণা বাড়ানো। কারণ এর প্রচারণা বৃদ্ধি পেলে নারীরা কতভাবে যে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে তা সবাই জানতে পারবে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
ইত্তেফাক/আরএম