বেহাল অবস্থাই যেন রীতি হইয়াছে

অবকাঠামোর দিক হইতে বিচার করিলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অচিন্তনীয় উন্নয়ন ঘটিয়াছে। এই সেই দিনও উপজেলা পর্যায়ে যেই হাসপাতাল ছিল কুঠুরির মতো, মাত্র ৩১ বা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট, তাহাই আজ বড়বড় ভবনে স্থাপিত হইতেছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রাখিয়া ৫০ শয্যার হাসপাতাল ১০০, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০০ শয্যার হাসপাতালে রূপ লইতেছে। ঝকঝকে নূতন ভবন, নূতন সরঞ্জাম দেখা যাইতেছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলির উন্নয়নের প্রশংসা না করিলেও ভালো শুনা যাইবে না। কিন্তু খানিকটা দেখিতে সুস্বাস্থ্যবান অথচ হূিপণ্ড দুর্বল ব্যক্তির মতো অবস্থা তৈরি হইয়াছে এই হাসপাতালগুলির। অবকাঠামোগতভাবে শক্তিশালী হইলেও অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে নানাবিধ অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা জাঁকিয়া বসিয়াছে। ধরা যাউক, একটি ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত পদসংখ্যা রহিয়াছে ১৫৯ জন। দেখা যাইতেছে সেইখানে কর্মরত রহিয়াছেন ১২০ জন। বাকি ৩৯টি পদ শূন্য পড়িয়া আছে! অধিকন্তু কাহাকেও আবার ঐ হাসপাতাল হইতে প্রেষণে অন্যত্র  পোস্টিং দেওয়া হইতেছে এমনকি একই স্টেশনে মেয়াদ (ডিউ) পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহা তদবির কালচারের ফল। কারণ অনেকেই উপজেলায় না থাকিয়া ঢাকায় বা বড় শহরে থাকিতে চাহেন, যেইখানে তাহাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস ‘জমিয়া’ উঠিতে পারে। আবার কর্মরত লোকবল যাহা আছে তাহার মধ্যেও আনুপাতিক ভারসাম্য নাই। যেমন হয়তো কর্মরত সাত জন পুরুষ চিকিত্সকের বিপরীতে এক জনও নারী চিকিত্সক নাই। ডাক্তারের অনুপাতে নার্স অথবা নার্সের অনুপাতে ডাক্তারের ব্যবধান রহিয়াছে বিস্তর। নিশ্চয়ই ইহা দেখিবার দায় প্রথমত সিভিল সার্জন দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের?

এই রকমের বেহাল অবস্থার কথা জানিতে হইলে আগে বুঝিতে হইবে ‘হাল’ জিনিসটা কী। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে দায়িত্ব পালন করেন তাহার লিখিত বর্ণনাই হইল প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধি। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কার্যপরিধি একটি অপরিহার্য বিষয়। দুঃখের বিষয়, কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই। উপজেলা পর্যায়ে মেডিক্যাল অফিসার, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার হইতে শুরু করিয়া জেলায় সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পর্যায়ে পরিচালক, অধিদপ্তরে রহিয়াছেন সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক এবং মহাপরিচালক; মন্ত্রণালয়ে রহিয়াছেন সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব মহোদয়। বলিবার অপেক্ষা রাখে না তাহাদের প্রত্যেকের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা, চলাচলের জন্য গাড়ি প্রস্তুত থাকে। এই সকল অব্যবস্থাপনা কি তাহাদের গোচরে নাই? কোনো জবাবদিহিতা নাই? সংসদেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় লইয়া বিস্তর আলাপ হইয়াছে। কিন্তু কেহই এই প্রশাসনিক কাঠামো লইয়া কিছু বলেন না।

শুধু সরকারিই বরাদ্দই নহে, আমাদের জানামতে, ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকে হাসপাতালগুলিতে অনুদান দিয়া থাকেন। কোথাও কোথাও বেডশিট, অক্সিজেন সিলিন্ডারও ব্যক্তি পর্যায় হইতে দেওয়া হইয়াছে। দেওয়া হইয়াছে নগদ অর্থও। করোনা ভাইরাস এখন দুয়ারে নহে, গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াছে। টিকা কত আসিল, কত আসিল না উহা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু প্রায় দেড় বত্সর সময় পাওয়া গিয়াছে করোনার আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণের জন্য। তাহার কতটা প্রস্তুতি লওয়া হইয়াছে? শুধু যে টিকাই রক্ষা করিবে তাহা তো নহে! কিন্তু লক্ষ্য করা গিয়াছে, হাসপাতালগুলি কোনোভাবেই প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে পারে নাই। এই জন্যই বিশেষজ্ঞরা বলিয়া থাকেন, এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলিতে আসলে সঠিক কাঠামোই গড়িয়া তোলা যায় নাই। অথচ সব দোষ গিয়া পড়ে রাষ্ট্রের ১ নম্বর ব্যক্তির উপর। এই সকল দেশে আমরা দেখিয়াছি, শতশত প্রধান নির্বাহীকে ক্ষমতা ত্যাগ করিতে হইয়াছে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে। অথচ এই যে যাহারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না, যাহারা প্রকৃত অর্থে দায়ী তাহারা থাকিয়া যান ধরাছোঁয়ার বাহিরে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কী হইতেছে, করোনা লইয়া কতটা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হইতেছে তাহা গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা দেখিতে পাইতেছি। সুতরাং শুধু ভ্যাকসিন-ভ্যাকসিন না করিয়া সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হইবে।