প্রতিটি মানুষই নিজের মতো করে সুন্দর। কিন্তু সেই বিষয়টিকে মেনে নেওয়ার মতো সৎ প্রবণতা আমাদের মাঝে নেই। তাইতো হুটহাট আমরা কারো কারো দৈহিক আকার, ওজন, আয়তন বা গড়ন নিয়ে প্রকাশ্যে ঠাট্টা, সমালোচনা, বিদ্রুপ করি। নোংরা মন্তব্য ছুঁড়ে দেই, অসভ্য-বর্বর এই কাজটি হলো বডি শেমিং।
অমুক মোটকা তমুক শুটকি, ওই তো বাট্টু আসে বা কি রে লম্বু, আর কতো লম্বা হবি? বিয়ে তো হবে না রে বাছাধন। কোন গুদামের চাল খান যে ভুড়ি জামা ছিঁড়ে বের হয়ে যাচ্ছে, সুমো কুস্তিগীর। মেয়েটা তো কালো না, একেবারে আলকাতরার ড্রাম। আর যা শুকনা রে বাবা, মা-বাবা মনে হয় খেতেও দেয় না- এর থেকেও আজব আজব ভয়াবহ মন্তব্য করেন মানুষরূপী অনুভূতিশূন্য অমানুষরা। এতে কে লজ্জাবোধ করলো বা অপমানিত হলো, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না বরং আরো মজা পায়।
সম্প্রতি আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার দশম শ্রেণী পড়ুয়া ১৬ বছল বয়সী কিশোর আজওয়াদ আহনাফ করিম বডি শেমিংয়ের শিকার হয়ে মারা গেছে। বয়সের তুলনায় তার ওজন বেশি ছিল। এটা নিয়ে তার সহপাঠী, এমন কি স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যেও কয়েকজন ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেতা। এতে বিব্রত আজওয়াদ এই সমস্যার কথা বাসায় এসে বলেছেও। স্কুলেও যেতে ভয় পেত। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় বাসায় ব্যায়াম করা বাড়িয়ে দেয় আজওয়াদ। ভুল ডায়েট ও শরীরচর্চায় ৯৩ কেজি ওজন থেকে দ্রুত কমতে থাকলে জটিলতা দেখা দেয়। অবশেষে চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সব চেষ্টা বৃথা করে গত ২৬ জুন আজওয়াদ ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যায়।
কিন্তু এই দায়টা কার? ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেখানকার শিক্ষার্থী, গুটি কয়েক নোংরা মনের শিক্ষক নামের কলংক, নাকি সন্তানের প্রতি উদাসীন বাবা-মা? তাই এখনই বন্ধ হোক বডি শেমিং বা শারীরিক বুলিংয়ের মতো সামাজিক বর্বর ব্যাধি। যাতে আর কোনো আজওয়াদ হারিয়ে না যায়।
অতিরিক্ত বা কম ওজন, গায়ের রঙ, চোখ ছোট-বড়, নাকটা একটু বোঁচা, মুখে ব্রণ বা কাটা দাগ আছে- এমন চেহারা নিয়ে প্রতিদিন হাসি-ঠাট্টার ছলে আমরা কতকিছুই না বলে থাকি। এ সব বাজে কথা প্রতিনিয়ত শুনতে শুনতে ওই ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকেন। তার মধ্যে তৈরি হয় একধরনের বিষন্নতা, যা ধীরে ধীরে মানসিক অসুস্থতায়ও পর্যবসিত হতে পারে। যে যেমন, তাকে তেমনভাবে মেনে নিতে না পারার ব্যর্থতা আমাদের, এই দায় আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।
আমাদের মস্তিষ্কে সৌন্দর্যের এমন কিছু বাঁধাধরা কষা ছকের সংজ্ঞা ঢুকে গেছে, যা থেকে বেরিয়ে আসা বেশ কষ্টসাধ্য। মানুষ যতোই কুঁ কথা বা নেতিবাচক মন্তব্য করুক না কেন, নিজের উপর কখনোই বিতৃষ্ণা জন্মাতে দেওয়া যাবে না। নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে কোনো ভাবেই হা-হুতাশ করবেন না, অন্য কারো সাথে তুলনা করে নিজেকে ছোটও করবেন না। শরীর খুব ক্ষণস্থায়ী একটি অস্তিত্ব। মরে গেলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায় শরীর। আর অনন্তকাল থেকে যায় কর্ম। একটি সুন্দর মন পাল্টে দিতে পারে একটি সমাজ। তাই জীবন সুন্দর। জীবনকে ভালোবাসুন। অন্যের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাজে মন্তব্যে নিজের জীবনের অনিষ্ট করবেন না। আপনি আপনার মতো সুন্দর, যা পৃথিবীর কাউকে দেওয়া হয়নি। সেই সুন্দর নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন, দেখবেন জীবন কতোটা সহজ, কতোটা সাবলীল, প্রতিটি মূহুর্ত কতোটা সুন্দর।
ইত্তেফাক/আরএম