ফেসবুক সৃজনশীলতার মাধ্যম হোক

ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিশ্বের বহু মানুষের দিন যাপনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। আর এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশাধিকার দেয় ইন্টারনেট। সেজন্য কেউ কেউ বলেন, খাবার না খেয়ে এক দিন থাকা গেলেও ইন্টারনেট ছাড়া এক মুহূর্ত পার করা অসম্ভব। আর করোনাকালে এগুলো যেন সবাইকে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, যেন এক নেশায় পরিণত হয়েছে। আর এ নেশায় বুঁদ হয়ে অনেকেই দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ ভুলে থাকায় চেষ্টা করছে, কেমন জানি এক বন্ধনে জড়িয়ে গেছে।

মার্ক জুকারবার্গ ২০০৪ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি তার কলেজ রুমমেট হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এডুয়ারদো সাভেরিনসহ সামাজিক নেটওয়ার্কিং পরিষেবা ‘দি ফেসবুক ডট কম’ উদ্ভাবন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ওয়েবসাইটটির সদস্যপদ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, পরে সেটা বোস্টন শহরের অন্যান্য কলেজ ও স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। ২০০৫ সালে নাম পালটে ‘দি ফেসবুক ডটকম’ কোম্পানির নাম রাখা হয় ‘ফেসবুক’ এবং ঐ বছরের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৫ লাখে উন্নীত হয়। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার প্রকৃত (ভ্যালিড) ইমেইল অ্যাড্রেসধারী সর্বোচ্চ ১৩ বছর বয়সি ছাত্রছাত্রীদের ফেসবুকের মেম্বার করা হয়। প্রতিনিয়ত ফেসবুকের ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে, বর্তমানে সারা বিশ্বে এ সংখ্যা ৩০০ কোটির কাছাকাছি।

অযুত জনকে একসঙ্গে দ্রুততম সময়ে কোনো খবর, তথ্য জানাতে ফেসবুকের কোনো জুড়ি নেই। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, ফেসবুক বন্ধুদের যে কোনো পোস্ট পলকে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেজন্যই হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক হয়ে উঠেছে অনন্য ও অদ্বিতীয়।

তার পরও ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই, কিন্তু কী সে অভিযোগ? বলা হচ্ছে—ছাত্রছাত্রীরা ‘পাঠ্যবই’ বাদ দিয়ে ‘ফেসবই’-এ ব্যস্ত থাকছে, লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রাত জেগে থাকছে, দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে ব্যস্ত মা সন্তানের দিকে ঠিকভাবে নজর দিতে পারছে না। কর্মজীবীরা দাপ্তরিক কাজের মধ্যে ফেসবুক চালিয়ে কাজের ক্ষতি করছেন। সবকিছু বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে কাটিয়ে দিচ্ছেন।

ফেসবুক কি শুধু ক্ষতিই করছে? আসলে দোষ তো ফেসবুকের নয়, আমরা কে কীভাবে একে ব্যবহার করছি, চর্চা করছি সেটাই বড় কথা। ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্যতম একটি প্ল্যাটফরম। এর মাধ্যমে বহু দিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনদের খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের খোঁজখবর নেওয়া থেকে শুরু করে সুখ দুঃখের অংশীদার হওয়া যায়। নজির আছে, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বন্ধুকে ফেসবুকের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া গেছে। ফেসবুক চালু হওয়ার আগে ঐসব মানুষগুলোর দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনায় শরিক হওয়া তো দূরের কথা, মৃত্যুসংবাদটাও জানা যেত না, ফেসবুকের কল্যাণে এখন সে খবরও মুহূর্তের মধ্যেই জানতে পারা যাচ্ছে। আসলে যে দুঃসংবাদগুলো ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে আসে না, ফোন করেও কেউ জানায় না এসব ক্ষেত্রে ফেসবুক অন্যতম ‘মাধ্যম’ হয়ে উঠেছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী জুম, গুগলমিট বা ফেসবুকের মাধ্যমে সেসব ক্লাসে যুক্ত হচ্ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে এসব ক্লাসে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী যুক্ত হতে পারছে। পদ্ধতিগতভাবে পাঠের বিষয়গুলোর লিংক দেওয়া হচ্ছে।

ফেসবুকে অনেকেই লিখছেন, হাত খুলে লিখছেন। নিজের অভিজ্ঞতা, জীবনকথা, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধসহ আরো কত কি! কেউ কেউ এ লেখাগুলো শুধু নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করছেন,  কেউ কেউ আবার সকলের পড়ার জন্য ‘পাবলিক’ করে দিচ্ছেন। ফেসবুক বন্ধুরা তা পড়ছেন, পাঠককুল বহু কিছু জানতে পারছেন, উপকৃত হচ্ছেন, নিজেকে সমৃদ্ধ করছেন। কোথাও আবার কোনো তথ্যবিভ্রাট থাকলে তাও শুধরে দিচ্ছেন। একজনকে দেখে অন্যরাও লেখালেখিতে উত্সাহিত হচ্ছেন, নিজেকে সম্পৃক্ত করছেন। এতে ‘লাইক’ পড়ছে, ‘কমেন্ট’-এর মাধ্যমে মোটামুটিভাবে লেখাটির একটা রিভিউ তাত্ক্ষণিকভাবেই হয়ে যাচ্ছে। ভালো মন্তব্যে লেখক উত্সাহিত হচ্ছেন, সোত্সাহে নতুন বিষয় নিয়ে লিখতে আগ্রহী হচ্ছেন। 

অনেকের মতে, ফেসবুকে লেখাগুলোর মধ্যে ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, রম্য রচনার কদর ও পাঠকসংখ্যা অনেক বেশি। তাই তো এ ধরনের পোস্টের মন্তব্যে প্রায়ই দেখা যায় ‘পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম’। ফেসবুকে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে লেখক ও পাঠকের একটি ব্যাপক-বিরাট প্ল্যাটফরম তৈরি হয়ে গেছে।

ফেসবুকের লেখালেখিতে একটি বিষয় প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে, তা হলো ভুল বানানে বাংলা লেখা। শুদ্ধ-অশুদ্ধ যা-ই হোক, আমরা ইংরেজি লিখবার সময় অনেক সতর্ক থাকি, পাছে যোগ্যতা ও স্মার্টনেস ধরে কেউ যেন টান দিতে না পারে। কিন্তু ভুল বানানে বাংলা লেখায় কারো দক্ষতা, যোগ্যতা নিয়ে সাধারণত কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, শোধরানোর কোনো তাগিদ নেই, গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে একই ভুলের  চর্বিত চর্বণ করেই চলেছি। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্ক্রল ও ফেসবুক পোস্টের দিকে তাকালে বোঝা যায় কত  অযত্ন, অবহেলা ও অজ্ঞতার সঙ্গে শব্দ ও বাক্যগুলো লেখা হচ্ছে। কোনো কিছু লেখার আগে সন্দেহ দেখা দিলে অভিধান দেখে সঠিক বানানে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে লেখার মান যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি প্রিয় ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধও অক্ষুণ্ন থাকবে।

ফেসবুক মূলত সুস্থ বিনোদনের একটি প্ল্যাটফরম, মানুষের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণাকে ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলিয়ে রাখে। বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে এটি লেখালেখি এবং জ্ঞানচর্চার প্ল্যাটফরম ও অফুরান তথ্যভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে যে যতটুকু শিখছে, জানছে ও নিজেকে সমৃদ্ধ করছে তা একেবারেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হচ্ছে। ফলে এ শিক্ষা, জ্ঞান ও উত্তম চর্চাগুলো মনের গভীরে গেঁথে যাচ্ছে। তাই ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলো আরো চর্চিত ও বিকশিত হোক—এটিই সকলের প্রত্যাশা । 

 n লেখক :সরকারি চাকরিজীবী