ই-কমার্সে আস্থা ফিরবে কি?

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, অসংখ্য মানুষ ঘরে বসেই তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের অর্ডার করছে। ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে সাত শতাধিক অনলাইন শপ ও ফেসবুকে পেজ খুলে পণ্য বিক্রি করছে ১০ হাজারেরও অধিক প্রতিষ্ঠান। এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং খাতটির আকার ৮ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে ই-কমার্স সেক্টরটি একটি উদীয়মান সেক্টর। কিন্তু খুব আশা জাগানো এই সেক্টর এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। হাজারো তরুণ উদ্যোক্তা ই-কমার্সে তাদের লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। এমনকি অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের থেকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বাকিতে পণ্য নিয়ে তাদের পাওনা টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করছে না।

করোনার এই ভয়াবহ সময়ে যেখানে ই-কমার্স হতে পারত মানুষের আস্থার প্রতীক, তা না হয়ে মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু মানুষের জন্য এটি তার প্রকৃত সৌন্দর্য হারাচ্ছে।

দেশে যত বেশি অনলাইন প্ল্যাটফরম বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সঙ্গে সমানতালে প্রতারণাও যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং সেই অর্থ তারা বিদেশে পাচার করেছে। সম্প্রতি দেশের নামকরা বড় কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করায় তাদের ই-বাণিজ্যের নামে প্রতারণার বিষয়টি জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফরমে প্রতিষ্ঠানগুলো ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাকের মতো অত্যন্ত লোভনীয় অফার দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে এবং তারা একধরনের পণ্য প্রদর্শন করে নিম্নমানের পণ্য ডেলিভারি দেওয়া কিংবা অনেক সময় অর্ডার করে পেমেন্ট সম্পূর্ণ করার পরও মাসের পর মাস ডেলিভারি না দেওয়ায় ক্রেতারা ই-কমার্সের ওপর তাদের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন। এর ফলে দেশের ভেতরে যেমনি অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, তেমনি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শুরু থেকেই সরকার যদি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখত তাহলে হয়তো এমন প্রতারণা কিছুটা হলেও ঠেকানো যেত।

ইদানীং অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, ইভ্যালি, সিরাজগঞ্জ শপসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে ধামাকা শপিং গ্রাহকদের ৫৮৯ কোটি টাকা হাতিয়ে এখন লাপাত্তা, ই-অরেঞ্জ নামের প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের কাছে মোট দায়ের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, অন্যদিকে ইভ্যালির কাছে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের পাওনা প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এমন অবস্থায় কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রায় দেউলিয়া ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু লাখ লাখ গ্রাহক, যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করেছেন বহু স্বপ্ন নিয়ে, তাদের টাকা ফেরত পাওয়ার চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে ই-কমার্স ব্যবস্থাপনা সুন্দর ও সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য যে নির্দেশিকা জারি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, তার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। তা না হলে এরকম প্রতারণার পুনরাবৃত্তি আবারও ঘটতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতারণার আশ্রয় নেবে, তাদের ত্বরিতগতিতে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ই-কমার্স প্রতারণা বন্ধে সরকারের পাশাপাশি গ্রাহকদেরও ভূমিকা রাখতে হবে, অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে প্রলোভিত না হয়ে মার্কেটপ্লেস যাচাই করে পণ্য অর্ডার এবং ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পণ্য বুঝে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

ই-কমার্সে ভোক্তার আস্থা অর্জন করা সব থেকে বড় শর্ত। কিন্তু দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে তাদের চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি জনমনে যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে হবে, না হলে ই-কমার্সের মতো সম্ভাবনাময় খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যেটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মোটেও মঙ্গলজনক হবে না। তাই এখনই সময় ই-কমার্স প্রতারণার রাশ টেনে ধরার মাধ্যমে ভোক্তার আস্থা বৃদ্ধি ও অধিকার নিশ্চিত করার। ডিজিটাল ব্যবসাকে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক সেক্টর হিসেবে গড়ে তুলে হাজারো কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। সুষ্ঠভাবে পরিচালিত ব্যবসাই একটি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

n লেখক: শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়