১৯ সেপ্টেম্বর ‘বঙ্গতাজ নবাব সিরাজউদ্দৌলা’-এর জন্মদিন। ত্যাগের মহিমায়, হে বঙ্গতাজ, তুমি চির অম্লান!
আজ দেশপ্রেমী ও বাংলার স্বাধীনতার চেতনা সৃষ্টিকারী বীর সন্তানের জন্মদিন। এ জন্যই হয়তো আজ তার নাম ও কাজ মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে! ঠিক যেমনটা করা হচ্ছে দেশ প্রেমিক নবাব আলিবর্দি খান, মহীয়সী নারী বেগম লুত্ফুন্নিসা, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ আরো অনেক বাংলার মহাপুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে; কিন্তু এই জাতি কোনো দিনও ভুলবে না তাদের।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৯ সেপ্টেম্বর ১৭২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পলাশীর যুদ্ধ শেষে শাহাদত বরণ করেন ২ জুলাই ১৭৫৭ সালে। তার ব্যাপারে পলাশির ষড়যন্ত্রকারীরা ও তথাকথিত বিজয়ী শক্তিরা কিছু ভুল ইতিহাস রচনা করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে বিজয়ীদের রচিত ইতিহাসই ইতিহাস নয়, প্রকৃত ইতিহাসের জন্য আমাদের নিরন্তর গবেষণা ও অনুসন্ধান চালানো দরকার। যুদ্ধকালে তার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা বেশি থাকলেও তিনি মিরজাফরসহ কতিপয় পথভ্রষ্ট সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতার কারণে শেষপর্যন্ত পরাজয় বরণ করেন। তার কাছের অনেক লোকই যুদ্ধে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তার ব্যাপারে আরেকটি প্রকৃত সত্য হলো—নবাব সিরাজউদ্দৌলা সাড়ে ২৮ বছর বয়সে বাংলার মসনদে আরোহণ করেন। তার শাসনকাল ছিল ১৪ মাস ১৪ দিন। এই অল্প সময় শাসনকার্য পরিচালনার মাধ্যমে তিনি বাংলার মানুষের হূদয় জয় করে নিয়েছিলেন। তিনি ২৩-২৪ বছর বয়সে শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন বলে যা বলা হয়, তা সঠিক নয়। তাকে অল্পবয়স্ক শাসক হিসেবে দেখাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তিনি যখন শাহাদাতবরণ করেন, তখন তার বয়স ছিল ২৯ বছর ৯ মাস ১৩ দিন।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছোটকালে গৃহশিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। নবাব আলিবর্দি খানের কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। তাই তিনি ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের সন্তান সিরাজউদ্দৌলাকে ‘পালক সন্তান’ হিসেবে গ্রহণ করেন। তত্কালে রাজদরবারে ফারসি ভাষার প্রচলন থাকলেও তিনি বাংলা ভাষা জানতেন। তিনি বাংলা নববর্ষ, পহেলা ফালগুন, নবান্ন উত্সব ইত্যাদি পালন করতেন। তিনি যুবরাজ থাকাকালীন মারাঠা ও বর্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
নবাব আলিবর্দি খানের নবাবি আমলে একদিন বাংলায় ১৭৫৫ সালের জুন মাসে ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাংলার অনেক মানুষ সিরাজ-লুত্ফার হিরাঝিল প্রাসাদে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এমন সময় বাংলার তত্কালীন যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার হিরাঝিল প্রাসাদের জানালায় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে একটা বুলবুলি পাখির মৃত্যু হয়। অন্ধকারে লুকিয়ে ক্রন্দনরত যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলাকে তার প্রিয় নানাজান নবাব আলিবর্দি খান দেখে ফেলেন। বাংলার দুশমনদের বিরুদ্ধে সারা দিন যুদ্ধরত যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা নবাব আলিবর্দি খানকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার প্রাসাদে এত মানুষের জায়গা হলো, অথচ এই ছোট্ট বুলবুলি পাখিটার জায়গা হল না’।
আরেকটা কথা যা না বললে নয়। যা কিনা ১৭৫৪ সালে যখন নানাজান আলিবর্দি খান বর্গি দমনে এবং দেশের শাসনকার্য নিয়ে ব্যস্ত, তখনকার ঘটনা। সময়মতো দরবারে আসা যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার অভ্যাস। সে সময় একদিন তিনি যথাসময়ে দরবারে এসে দেখলেন, তার প্রিয় কথা বলা টিয়া পাখিটি তখনো আসেনি। যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার এই অভ্যাসের ফলে দরবারের অন্যতম আকর্ষণ টিয়া পাখিটিও যথারীতি তার আগেই দরবারে পৌঁছে যেত। তাই টিয়া পাখিটির দেরি দেখে তিনি নিজেই টিয়া পাখিটির খোঁজে বাগিচায় চলে গেলেন। তার অন্য সব দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দরবারে এসে যুবরাজকে না পেয়ে হিরাঝিল প্রাসাদের বাগিচায় খোঁজাখুঁজি শুরু করে এক পর্যায়ে পেয়ে গেলেন। গিয়ে দেখেন, বাগিচায় আর কেউ নেই, শুধু যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা তার প্রিয় আঘাতপ্রাপ্ত টিয়া পাখিটিকে সেবাযত্ন করে সুস্থ করবার চেষ্টা করছেন।
এই সেই আমাদের প্রিয়জন বাংলার বীর দেশপ্রেমিক ‘সিরাজউদ্দৌলা’। তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন এই দেশের মা মাটি মানুষ ও প্রকৃতিকে। তার এই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিল না সামান্য টিয়া পাখিটিও, এমনকি বঞ্চিত ছিল না ১৭৫৫ সালের সেই ঘূর্ণিঝড়ে মারা যাওয়া সেই ছোট্ট বুলবুলি পাখিটিও।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭২৭ সালের আজকের দিনে তত্কালীন দুই বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করে বাংলাকে আলোকিত করেন, তাই তো তিনি আজো বাংলার সব প্রকৃত দেশপ্রেমী হূদয়ের নয়নমণি। তাকে বঙ্গতাজ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। আজকের এই শুভ জন্মদিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বঙ্গতাজ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে এবং মহান আল্লাহর কাছে তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ তায়ালা তাকে ও তার পরিবারের মরহুম সদস্যদের জান্নাতবাসী করুন।
n লেখক :নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম