গল্পকথায় পদার্থবিজ্ঞান
গল্পচ্ছলে বলার এক নিজস্ব ঢং
ডক্টর সুশান্ত কুমার দাস,
সাবেক অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
‘গল্প কথায় পদার্থবিজ্ঞান’ তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, এছাড়া একই শিরোনামে এই গ্রন্থের লেখা দীর্ঘদিন যাবত নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে দেশের প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের অনুশীলন পাতায়। এসব লেখনিতে লেখক পদার্থবিজ্ঞানের সরল বা জটিল সব বিষয়েই গল্পচ্ছলে বলার এক নিজস্ব ঢং বা ধরন তৈরি করেছেন। এটা শুধু সাধুবাদের বিষয় নয়, যথারীতি ধন্যবাদার্হ। বিজ্ঞান পড়া আর বিজ্ঞান আত্মস্থ করা এক জিনিষ নয়। গল্পচ্ছলে যখন বিজ্ঞান আলোচিত হয়, তখনআপাতঃদৃষ্টিতে তা সহজ, দৈনন্দিন, আটপৌড়ে মনে হলেও তা কিন্তু গভীর উপলব্ধিজাত। তৃতীয়খণ্ডে লেখক পদার্থবিজ্ঞানের অতি সামপ্রতিক বিষয়ের যেমন অবতারণা করেছেন, তেমনি, চিরায়ত বা যাকে বলা হয় ‘ক্লাসিক্যাল’ তারও আলোচনা করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আর আইনস্টাইন প্রসঙ্গে দর্শনের একটি মূল বিষয়ের অবতারণা এসেছে, যা বিজ্ঞানের সঙ্গে দার্শনিক ‘বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর’ সম্পর্ক নির্ধারণ করে। আইনস্টাইন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দর্শনের এই বিষয় থেকে সরে আসেননি। ‘বস্তুজগতের অস্তিত্ব যে চেতনা নিরপেক্ষ এবং প্রকৃতিতে বস্তুগত চলে এক নির্দিষ্ট নিয়মে’ দর্শনের এই বিষয় আইনস্টাইন দৃঢ়ভাবে মনে করতেন। লেখক মাধব রায় মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য, নক্ষত্রের জন্মমৃত্যু বা মহাবিশ্বের পরিণতির বিষয়ে যতটা সম্ভব আধুনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে সহজভাবে গল্পচ্ছলে বলেছেন। এটি একটি দূরূহ কাজ তা তিনি সম্পাদন করেছেন, এবং তা করেছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে। তাঁর ভাষা প্রাঞ্জল, এবং বিজ্ঞানের পরিভাষাকেও তিনি অবহেলা করেননি। এছাড়া লেখক যে সকল ‘চিরায়ত’ বিষয় এ খণ্ডে আলোচনা করেছেন যেমন দোলক, তড়িতচুম্বকীয় আবেশ, এসি-ডিসি, সূর্যগ্রহণ, কেপলার-এর সূত্র, পৃথিবীর চৌম্বক উপাদান বা রঞ্জনরশ্মি-তা করেছেন অত্যন্ত ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতা থেকে। যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে, বই এর একই খণ্ডে পদার্থবিজ্ঞানের এত বিভিন্ন বিষয়ে অবতারণা কতটা সংগতিপূর্ণ? উত্তরে বলা যায়, যেহেতু বিষয়গুলো এসেছে গল্পচ্ছলে, সেহেতু একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা বই এর সঙ্গে এর মৌলিক ফারাক আছে। মানুষের মন যখন গল্পের জগতে বিচরণ করে, তখন তা নির্দিষ্ট ছকে চলে না, চলে বিচিত্র অনুভূতি আর জিজ্ঞাসা নিয়ে। লেখকের বিষয় নির্বাচন এসেছে সেভাবেই। তিনি সংগতভাবেই তা করেছেন। তাছাড়া আটপৌড়ে জীবনে যে প্রশ্নগুলো মানুষকে বিদ্ধ করে, সেগুলোই আলোচিত হয়েছে। ফলে তা পেয়েছে সার্বজনীনতা।
লেখক আমার সরাসরি শ্রেণিকক্ষের ছাত্র নয়, তবে ছাত্রপ্রতিম। তিনি এখন একজন ঋদ্ধ পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক, তা প্রমাণিত। কোনো বিষয়কেই তিনি হালকাভাবে নেননি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তাঁর এই নিজস্বতা তাঁকে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের অঙ্গণে সমাদৃত করবে।
বইটি সুখপাঠ্য এবং বাংলা ভাষায় একেবারেই নতুন ধারার। নবীন প্রবীণ সকল মানুষের বিজ্ঞানমনস্ক জিজ্ঞাসাকে এ বই তৃপ্ত করবে, তা দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায়।