লোভ পরিহারের বিকল্প নাই

ই-কমার্সের ফাঁদ হইতে বাঁচিতে গ্রাহকদের লোভ কমাইবার পরামর্শ দিয়াছে মহামান্য হাইকোর্ট। এই ব্যাপারে জনস্বার্থে প্রচারণা চালাইবারও পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। ফোনালাপে আড়ি পাতা বন্ধে রিট শুনানিকালে গত রবিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মুস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই পরামর্শ দেয়। সাধারণত আমাদের দেশে ই-কমার্স ব্যবসায়ের নামে অস্বাভাবিক অফার দেওয়া হইতেছে। বিদেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান যেমন আলিবাবা বা আমাজনে এই রকম অফার দেওয়া হয় না। অতঃপর আমাদের গ্রাহকরা অতি লোভে পড়িয়া প্রতারণার শিকার হন। কথায় আছে, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। লোভ করিবার পরিণাম কখনো ভালো হয় না। অতি লোভ করিতে গিয়া অনেক সময় সর্বস্বান্ত হইতে হয়। এই জন্য আরেকটি প্রবাদ বাক্য আছে তাহা হইল—লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। অর্থাত্ লোভ মানুষের ধ্বংস ডাকিয়া আনে। লোভ করা ভালো নয় জানিয়াও আমরা লোভ করিয়া থাকি। বাল্যশিক্ষায় এই ধরনের নীতিকথা লিপিবদ্ধ আছে; কিন্তু আমরা সেই নীতিকথার কোনো তোয়াক্কা করি না। বাস্তব জীবনে তাহার প্রতিফলন ঘটাই না। ইহা হইতে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করি না।

হাইকোর্ট বলিয়াছে, আমাদের লোভ সংবরণ করিতে হইবে। আবার লোভ করিবার পরিবেশ যাহাতে তৈরি না হয়, সেই দিকেও সরকারের দৃষ্টি দিতে হইবে। এমনটি নহে যে, এই ধরনের প্রতারণার ঘটনা দেশে এই প্রথম ঘটিল। ইহার পূর্বে বিভিন্ন ‘হায় হায়’ কোম্পানির কথা আমাদের অজানা নহে। এক শ্রেণির ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তাহারই নূতন সংস্করণ। শুধু যে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানই এমন প্রতারণার সহিত জড়িত তাহা নহে। ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট হইতে জানা যায়, ই-কমার্স ও সমবায় সমিতির নামে ৩০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হইয়াছে। ২৬টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এখন তদন্ত চলমান। প্রশ্ন হইল, এই সকল প্রতারণা বন্ধে কি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে? এই সকল প্রতিষ্ঠানের সহিত বিভিন্ন প্রভাবশালী এমনকি জনপ্রিয় ব্যক্তিরাও কোনো না কোনোভাবে জড়িত বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। জনগণের পকেট কাটিয়া বিপুল অর্থ লোপাটের পরই আমাদের সংবিত্ ফিরে; কিন্তু প্রতারণা চলাকালে বা প্রাথমিক অভিযোগের সময় আমরা জনগণের পার্শ্বে দাঁড়াইতে অনেক সময় কার্পণ্য বোধ করি। ই-কমার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাতানো ফাঁদের ব্যাপারে জনগণকে যেমন সচেতন হইতে হইবে, তেমনি লোভের ফাঁদ যাহাতে কেহ সৃষ্টি করিতে না পারে, সেই ব্যাপারেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।

আমাদের দেশে শিক্ষার হার ক্রমান্বয়ে বাড়িতেছে। এই দেশের মানুষ দেশ-বিদেশ ঘুরিয়াও অনেক শিক্ষা লাভ করিতেছেন। তাহার পরও যখন প্রতারণার শিকার হন, তখন দুঃখের সীমা থাকে না। ই-কমার্সের মাধ্যমে যাহারা লোভে পড়িয়াছেন তাহাদের অধিকাংশই শিক্ষিত। অবশ্য ই-কমার্স সম্পর্কে অনেকের কার্যকর শিক্ষারও অভাব থাকিতে পারে। আবার যখন এমন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় যে, একটা কিনিলে আরেকটা ফ্রি, বিমানের টিকিট কিনিলে হোটেলে থাকা ফ্রি ইত্যাদি, তখন এই ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করিয়াই পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। লোভ না করিবার ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। যেমন—কোরআন শরিফে বলা হইয়াছে, ‘যাহা দ্বারা আল্লাহ তোমাদের কাহাকে অপর কাহারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন, তোমরা তাহার লালসা করিও না (সুরা আন-নিসা, আয়াত-৩২)। এই লোভ-লালসা মানুষের অন্তরের মারাত্মক ব্যাধি। তাই মহানবি (স.) বলিয়াছেন, ‘দুইটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘ ছাগলের পালে ছাড়িয়া দিলে যেই রকম ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, সম্মান লিপ্সা ও সম্পদের লোভ মানুষের দিনের জন্য তাহার চাইতেও অধিক ক্ষতিকর (তিরমিজি)। এদিকে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্র হইতেছে ‘অহিংসা পরম ধর্ম’। এই ধর্মে দুঃখ নিরোধের পন্থা হিসাবে যেই আটটি উপায়ের কথা বলা হইয়াছে তাহার অন্যতম সত্-লোভ। সনাতন ধর্মে ষড়িরপুর কথা বলা হইয়াছে যাহা হইল—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাত্সর্য। অতএব, প্রতারণার ফাঁদ হইতে পরিত্রাণ লাভে আমাদের লোভ পরিহারের কোনো বিকল্প নাই।