পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র বাংলাদেশ। পর্যটক আকর্ষণের যতগুলো উপাদান থাকা দরকার, তার সবগুলো উপাদানই বাংলাদেশে বিদ্যমান। যদিও বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অনুযায়ী পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন করতে পারেনি। পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক। আর বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে করোনা-উত্তরকালে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের গুরুত্বই হবে সর্বাধিক।
বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ করে থাকেন। ২০১২-১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৫-৩০ লাখ, যা ২০০০ সালের দিকে ছিল ৩-৫ লাখ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে SDG উত্তরণে শীর্ষ তিনে অবস্থান করছে। অর্থাত্, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কারণে আগের চেয়ে ভ্রমণে মানুষের আগ্রহ অনেক গুণ বেড়েছে। আর অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে এই পরিবর্তন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে ২৩ লাখ। অর্থাত্, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, এদের ওপর নির্ভরশীল কমপক্ষে দেড় কোটি মানুষ। এই বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যার বর্ধিত আর্থিক মূল্য বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১/৯ শতাংশ কর্মসংস্থান হবে পর্যটনশিল্পে। তবে ‘ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইনডেস্ক’-আইডিআই ২০১৮ র্যাংকিংয়ে দেখা যায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে (আইডিআই) দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪, যা মোটেই সন্তোষজনক নয়। অর্থাত্, অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশ এখনো অনেক পেছনে বলা যায়।
করোনা ভাইরাস মহামারিতে বৈশ্বিক পর্যটন খাত সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে একটি। করোনাকালে পর্যটন খাত ইতিহাসের সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু ২০২০ সালেই হাজার হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ থাকা, বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাসহ সব মিলিয়ে বাকি সবার মতো বাংলাদেশও পর্যটন খাতে কঠিন সময় পার করেছে। বর্তমান সময়ে এসে কোভিড আতঙ্ক কিছুটা কমলেও বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়ছে না। পরিসংখ্যানমতে ২০১৯ সাল জুড়ে আমাদের দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার ২৯৫, যার অধিকাংশ ভারতীয়। মহামারিতে ভারতীয় সীমান্তপথগুলোও বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিগত দেড় বছর কখনো বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা কখনো বাইরের দেশ থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ছিল।
সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন দেশ তাদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিলেও পর্যটকেরা বর্তমানে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয় বিদেশ ভ্রমণে। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় মানুষ করোনা-পরবর্তীকালে বর্তমানে পর্যটন স্পটগুলোতে অধিক ভিড় জমাচ্ছে। কোভিড-১৯ জনজীবনে যে অচলায়তন অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণপিপাসা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে পর্যটক বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ পর্যটনে বড় রকমের পরিবর্তন আসবে বলা যায়। পর্যটক বিশ্লেষকদের মতে, কোভিড-১৯-উত্তরকালে বিশ্বে যে কয়েকটি খাতের অধিকতর উন্নতি ঘটবে, তার মধ্যে পর্যটন খাত উল্লেখযোগ্য। তাদের মতে, আগামী দুই বছর LONG HAUL TOURISM না-ও হতে পারে। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও পর্যটকদের মনে আশঙ্কা কাটেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে এই বিদেশি পর্যটক খরা অব্যাহত থাকবে। সেক্ষেত্রে ডোমেস্টিক ট্যুরিজমের উত্থান অনেকটা অবশ্যম্ভাবী। আর এই সম্ভাবনাময় ডোমেস্টিক ট্যুরিজমের মাধ্যমেই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
পর্যটনকে কেন্দ্র করে অবহেলিত জনপদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। প্রত্যন্ত অঞ্চল যখন পর্যটনের আওতায় আসে, তখন সেখানকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। একজন পর্যটকের সঙ্গে রয়েছে তার ব্যবহার্য শত শত পণ্যের সম্পর্ক। এসব পণ্যের সংশ্লিষ্ট খাত জীবনযাত্রা উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সারা বিশ্বে প্রান্তিক পর্যটনে প্রধানত পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যার সব কটিই রয়েছে বাংলাদেশে। দেশের অভ্যন্তরেই এক অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে পর্যটনের বিষয়বস্তু হয়ে থাকে। সেসবের উপযুক্ত উপস্থাপনই অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এছাড়া যারা চিরায়ত হস্তশিল্প, কারু ও মৃত্তিকাশিল্পের সঙ্গে জড়িত, তাদের কেন্দ্র করে উদ্যোগ নিলে পর্যটন স্পটগুলোতে আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। এসব ক্ষেত্রে নারীরা বিভিন্নভাবে জড়িত থাকায় গ্রামীণ নারীদের আর্থিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন, প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মহলের যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়