সংকুচিত হচ্ছে সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন ও চলনবিল

সুন্দরবন বাংলাদেশের জাতীয় বন। এই বন ও বনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে আমরা সব সময় গর্বিত। কারণ বিশ্বের রোমাঞ্চকর অরণ্যগুলোর মধ্যে সুন্দরবন একটি, যার ফলে সুন্দরবন নিয়ে আমাদের ভাবনারও শেষ নেই। এই বন দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে যেভাবে তছরূপের শিকার হচ্ছে, তেমনি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলেও পড়ছে বারবার। 

ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বৃক্ষনিধন, অগ্নিকাণ্ড, চোরাকারবারিদের আধিপত্যসহ নানাভাবে বন তছরুপের শিকার হচ্ছে। হালে যোগ হয়েছে বনভূমি দখল ও নদীভাঙন। দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচলের কারণে বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। উত্তাল পশুর ও ভোলা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ডিসিআরের নামে চর দখল করে নিচ্ছে। সেই সুবাদে ভূমিহীনরা গড়ে তুলছে জনবসতি, এতে করে আয়তনে ছোট হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় জাতীয় বন সুন্দরবন।

অন্যদিকে দেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত একমাত্র প্রবালরাজ্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। দ্বীপটির অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে। আয়তন খুব বেশি নয়, মাত্র সাড়ে ৮ বর্গকিলোমিটার। জোয়ারের সময় আয়তন খানিকটা হ্রাস পেয়ে ৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। এটি টেকনাফ উপজেলাধীন ইউনিয়ন। টেকনাফ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এই দ্বীপে রয়েছে প্রকৃতির অজস্র সম্পদ। এখানে রয়েছে বিলাসবহুল হোটেল-মোটেলসহ বেশ কিছু পাকা-সেমিপাকা দরদালান; যা ছিল না বিগত এক যুগ আগেও। এসব গড়তে গিয়েই সেন্ট মার্টিনের মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে হচ্ছে। ফলে ভরা বর্ষায় দ্বীপ ভাঙনের কবলে পড়ে সংকুচিত হয়ে এর আয়তন হ্রাস পাচ্ছে।

অন্যদিকে চলনবিলের অবস্থাও তদ্রূপ। এই বিল রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এটি দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জলাভূমি। ৩টি জেলা, ৮টি উপজেলা, ৬০টি ইউনিয়ন, ১ হাজার ৬০০ গ্রাম এবং ১৪টি নদী নিয়ে চলনবিলের বিস্তৃতি। বিশাল এই বিলের আয়তন নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়ে গেছে আজও। ১৯১৯ সালে ‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’র হিসেব মতে, চলনবিলের আয়তন ৫০০ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। অপর দিকে ১৯৬৮ সালের জরিপ মোতাবেক চলনবিলের আয়তন ৮০০ বর্গমাইল বা ২ হাজার ৭১ বর্গকিলোমিটার বলা হয়েছে। এক সমীক্ষায় জানা যায়, বর্তমানে চলনবিল অনেকখানি হ্রাস পেয়ে আয়তন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটারে।

যতদূর জানা যায়, চলনবিল সংকুচিত হওয়ার পেছনে রয়েছে তিনটি বড় কারণ। প্রথমত, চলনবিলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ২২২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করছে। তার মধ্যে বিলের আশপাশ বা সীমানা এলাকা থেকে ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিলে ঢুকছে। আর বাকি ১৬৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি নদী দিয়ে বর্ষা মৌসুমে বিলে প্রবেশ করছে। এতে করে বিল দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। (ড্রেজিং ব্যবস্থা থাকলে পলি ভরাট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেত) দ্বিতীয়ত, বিল এলাকায় অপরিকল্পিত বসতবাড়ি স্থাপনের কারণে ক্রমেই চলনবিল সংকুচিত হয়ে আসছে। তৃতীয়ত, চলনবিল এলাকার আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে অনেক রাস্তাঘাট নির্মিত হওয়ায় বিলের পরিধি হ্রাস পেয়েছে অনেকটাই।

উল্লেখিত কারণ ছাড়াও দেখা গেছে, জাতীয় প্রয়োজনে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কিলোমিটারের একটি মহাসড়ক নির্মিত হয়েছে চলনবিলের দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা দখল করে। এই দীর্ঘ রাস্তাটি নির্মিত হওয়ার ফলে এলাকাবাসী উপকৃত হলেও চলনবিলের আয়তন হ্রাস পেয়েছে বেশ খানিকটা। আরেকটি বিষয় লক্ষ করা গেছে, এ ধরনের রাস্তা নির্মাণের পেছনে প্রথমে ভূমিকা নিয়েছেন স্থানীয় লোকজনই। তারা বিলের পানি শুকিয়ে গেলে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাতায়াত করতে প্রথমে মেঠোপথ তৈরি করেন। তারপর স্থানীয় সরকারের কাছে সেসব স্থানে সড়ক নির্মাণের দাবি রাখেন। একটা সময় এলাকাবাসীর দাবি পূরণ হয়ে জন্ম নেয় নতুন সড়কের। আর সেটি একসময় পরিণত হয় মহাসড়কে।

আগেই বলেছি, চলনবিল আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জলাভূমি। অবশ্যই বলা যায়, বাংলাদেশের নিম্ন জলময় ভূভাগের মধ্যে একমাত্র চলনবিলই আয়তনের দিক দিয়ে সর্ববৃহত্। এই অঞ্চলের মানুষের অভিমত, চলনবিল হচ্ছে তাদের জন্য শস্যখনি। বাস্তবেও তাই। কারণ এখানকার মাটি বেশ উর্বর। বিল শুকিয়ে এলে উর্বর মাটিতে কৃষকেরা ধানের চারা রোপণ করেই উল্লাস করেন। কারণ তারা জানেন স্বল্প ব্যয়ে তাদের গোলা ভরে যাবে সোনালি ধানে। শুধু তাই-ই নয়, বর্ষার শেষ নাগাদ পর্যন্ত চলে এখানে মাছ ধরার মহোত্সব। সেই হিসাবে চলনবিলকে মৎস্যখনিও বলা যায়। এখানে রয়েছে দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভান্ডার। কী মাছ নেই এখানে? রুই, কাতল, চিতল, বোয়াল থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি পর্যন্ত এই বিলে কিলবিল করে। বিল এলাকার গৃহস্থদের এ সময় মাছ কেনার প্রয়োজন পড়ে না। জেলে সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তারাও মাছ শিকার করে নিজেদের পারিবারিক চাহিদার জোগান দেয়। চলনবিলে ইদানীং আরেকটি ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। সেটি হচ্ছে ঝিনুক-মুক্তার বাণিজ্য। জানা গেছে, এই বিলের জলে প্রাকৃতিক নিয়মে ঝিনুকের পেটে প্রচুর মুক্তার জন্ম হয়। এলাকার বেকার নারীরা ঝিনুক কুড়িয়ে পেট চিড়ে মুক্তা সংগ্রহ করে বড় বড় কারবারির হাতে তুলে দেন। অপর দিকে মাছচাষিদের হাতে তুলে দেন ঝিনুকের মাংস। বিনিময়ে তারা উপার্জন করেন নগদ অর্থকড়ি।

সমগ্র দেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে যখন পানির সংকট দেখা দেয়, তখন চলনবিলের গড় গভীরতা থাকে তিন ফুট। অন্যদিকে নদীগুলোতে সারা বছরের গড় গভীরতা থাকে ৮ থেকে ১২ ফুট, যা আমাদের জন্য প্রকৃতির একটি বিশেষ উপহার বলা যায়। অথচ আমরা তার সঠিক ব্যবহার করতে পারছি না।

সম্প্রতি জানা গেছে, পর্যটকদের সুবিধার্থে বিল এলাকায় কেউ কেউ মোটেল নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছেন। এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে এলাকার যুব সম্প্রদায়। তাদের ধারণা, হোটেল-মোটেলজাতীয় কিছু হলে বিপর্যয় নেমে আসবে চলনবিল এলাকায়। চলনবিল রক্ষা কমিটি গঠনের তাগিদ বোধ করছে তারা। অনেকে বিল রক্ষার্থে নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ারও অঙ্গীকার করছেন। আমরাও প্রশাসনের শুভদৃষ্টি কামনা করছি, যেন ঐতিহ্যবাহী চলনবিলকে সংকুচিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে তারা। কারণ এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি শুধু রাজশাহী বিভাগবাসীরই অহংকার নয়, এটি সমগ্র দেশবাসীর অহংকার।

আর হ্যাঁ, শুধু চলনবিলই নয়, দেশের অন্যান্য স্থানের জলাশয়গুলোরও করুণ অবস্থা। গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করছে মানুষ। আবাসন, ফ্যাক্টরি ও দোকানপাট গড়ার মানসিকতায় নদী-নালা, খালবিল ভরাট করছে দ্রুত। এ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ফসলি জমিও। মানুষের অধিক লোভের কারণে জলাশয়ের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন আজ। ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে জলাশয়গুলো। এসব সম্পদ রক্ষার্থে আমাদের যুবসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে, জনমত গড়ে তুলতে হবে, প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। তাহলে কিছুটা হলেও সুফল বয়ে আসবে। নচেত একদিন মানচিত্র থেকে জলাশয়গুলো হারিয়ে যাবে, আর সেগুলো উদ্ধার করাও কঠিন হবে। তখন অনুতাপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না আমাদের।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট