শিশুদের খেলার মাঠ ও আমাদের উদাসীনতা

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩০

আজিকার ইটপাথরের নগর-মহানগরে যে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের সহিত পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহা হইল শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবের অবলুপ্তি। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রধান শিরোনামের খবর হইতে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে প্রায় ১৫ সহস্রাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নাই। ঢাকা শহরের অর্ধেকেরও অধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭২ শতাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত। এই হতাশাজনক চিত্র আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে।

খেলার মাঠ কেবল ধুলাবালির চত্বর নহে, বরং ইহা শিশুর শরীর ও মনের সুষম বিকাশের প্রধান সূতিকাগার বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ইসলাম ধর্মেও শারীরিক সুস্থতা ও চিত্তবিনোদনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। যেমন—এই ব্যাপারে এক হাদিসে বলা হইয়াছে যে, একজন শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের অপেক্ষা অধিক উত্তম ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। মূলত শরীরকে সচল ও সবল রাখিবার অন্যতম মাধ্যম হইল ক্রীড়া ও দৌড়ঝাঁপ। মনীষী জন লক এই জন্য বলেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন' (A sound mind in a sound body )। আর এই সুস্থ দেহের জন্য চাই মুক্ত বাতাস ও খেলার মাঠ। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক জিন জ্যাক রুশো তাহার ‘ইমিল' গ্রন্থে শিশুর প্রাকৃতিক পরিবেশে মুক্তভাবে বাড়িয়া উঠিবার ও খেলার ছলে শিক্ষালাভের প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে সমর্থন করিয়াছেন। মাঠের অভাবে শিশুরা আজ গৃহকোণে বন্দি হইয়া ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হইতেছে। বিশেষত শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের এই সংকট অধিকতর প্রকট। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণামতে, ঢাকা শহরের স্কুলপড়ুয়া শিশুরা দৈনিক গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটায় মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রাখিয়া, যাহার ফলে তাহাদের ঘুম কমিয়া যাইতেছে, ওজন বাড়িতেছে এবং নানাবিধ মানসিক জটিলতা সৃষ্টি হইতেছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। এই ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও নির্দেশনা রহিয়াছে; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও, অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতি ক্ষুদ্র পরিসরে, গ্যারেজে কিংবা আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিকভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে। তাহা ছাড়া যেই সকল বিদ্যালয়ে মাঠ রহিয়াছে, সেইখানেও বিকালবেলা মাঠসমূহ তালাবদ্ধ করিয়া রাখা হয়। ইহাতে মাঠের সদ্ব্যবহার করা হয় না, যাহা দুঃখজনক। আবার রাজধানীর আসাদ গেটের লালমাটিয়া নিউ কলোনি মাঠের ন্যায় বহু মাঠ আজ অবৈধ দখল, কাঁচাবাজার ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হইয়াছে ৷ ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) এক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যেইখানে অন্তত ৬১০টি মাঠ প্রয়োজন, সেইখানে বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি।

এখন প্রশ্ন হইল, এই সংকট হইতে পরিত্রাণের উপায় কী? আমরা মনে করি, খেলার মাঠ ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর গড়িয়া তুলিতে দেওয়া যাইবে না। এই শর্ত অক্ষরে অক্ষরে মানিতে হইবে। ইহা ছাড়া আমাদের আরো কিছু করণীয় রহিয়াছে। প্রথমত, সরকারি নীতিমালা কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রাখিয়া, মাঠবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। নূতন বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাপের তথা আয়তনের খেলার মাঠের অস্তিত্ব সুনিশ্চিত করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি এলাকায় বেদখল হইয়া যাওয়া খেলার মাঠ ও পার্কসমূহকে অবিলম্বে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব হইতে মুক্ত করিয়া শিশুদের উপযোগী করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। তৃতীয়ত, যেই সকল মাঠে তালা লাগাইয়া রাখা হয়, বিদ্যালয় ছুটির পর আশপাশের শিশুদের জন্য সেই সকল মাঠ উন্মুক্ত রাখিবার নির্দেশ প্রদান করিতে হইবে। এই জন্য বিশেষ নীতিমালা করা যাইতে পারে। পরিশেষে, মনীষী ইমাম গাজ্জালির (রহ.) সেই অমূল্য বাণী স্মরণ করিতে হইবে–‘লেখাপড়ার পর শিশুকে খেলার অনুমতি দেওয়া উচিত, যাহাতে তাহার অবসাদ দূর হয়। খেলাধুলা বন্ধ করিলে শিশুর বুদ্ধি স্থবির হইয়া যায়।' অতএব, আমাদের শিশুদের সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপহার দিতে তাহাদের খেলার মাঠের অধিকার ফিরাইয়া দেওয়া আজ সময়ের দাবি।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন