বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে এমন কিছু নাম রহিয়াছে, যাহারা এই জাতির নন্দনচেতনার গভীরে প্রোথিত। বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সেই বিরল মহিরুহদের অন্যতম। তাহার প্রস্থান কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যু নহে—ইহা আমাদের শিল্প-ঐতিহ্যের এক দীপ্ত অধ্যায়ের অবসান । রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানের মধ্য দিয়া জাতি তাহার প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছে, তবে তাহার প্রকৃত সম্মান নিহিত রহিয়াছে তাহার সৃষ্ট শিল্পভুবনে, যাহা বহু প্রজন্মের নিকট চিরকাল প্রেরণার উৎস হইয়া থাকিবে।
মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি পাপেট আন্দোলনের অগ্রদূত, টেলিভিশনের সৃজনশীল নির্মাতা, শিশুদের নন্দনশিক্ষার পথিকৃৎ। তথাপি তাহার শিল্পীসত্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চিত্রকলা। কারণ, তাহার সমগ্র সৃজনযাত্রার উৎস ছিল তুলির ভাষা। তিনি রংকে কেবল দৃশ্য নির্মাণের উপকরণ বলিয়া মনে করেন নাই, রং তাহার নিকট ছিল মানবজীবনের অনুভূতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনুবাদ । কলিকাতা আর্ট কলেজে তাহার অসামান্য শিক্ষাজীবন তাহাকে দৃঢ় শিল্পভিত্তি প্রদান করিয়াছিল। তাহার জলরং, রেখাচিত্র ও অঙ্কনে বাংলার প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, কৃষিজীবন, নদীমাতৃক ভূখণ্ড এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এমন এক মমতায় ফুটিয়া উঠিয়াছে, যাহা দর্শককে বাহ্য দৃশ্যের অতীত এক অন্তর্লোকে লইয়া যায়। তাহার শিল্পে কৃত্রিম জাঁকজমক অপেক্ষা মানবিক সত্যের প্রকাশ অধিক শক্তিশালী । ইহাই তাহার শিল্পকে কালোত্তীর্ণ করিয়াছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উত্তরসূরি প্রজন্মের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার এক স্বতন্ত্র স্বাক্ষর । তিনি প্রমাণ করিয়াছেন, আধুনিকতার অর্থ শিকড় বিস্মৃত হওয়া নহে । বরং আপন মাটির গন্ধ, আপন মানুষের জীবন, আপন সংস্কৃতির আত্মাকে ধারণ করিয়াই বিশ্বজনীন শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব । তাহার ক্যানভাসে বাংলার আলো-ছায়া যেমন ধরা পড়িয়াছে, তেমনি ধরা পড়িয়াছে এক স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদা।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে শিল্পের এক বৃহৎ সংকট হইল আত্মপরিচয়ের সংকট। বহু শিল্পী আন্তর্জাতিকতার মোহে স্থানীয় জীবনবোধ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িতেছেন । মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্ম আমাদের শিক্ষা দেয়, বিশ্বকে স্পর্শ করিবার সর্বোত্তম পথ নিজস্ব সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ধারণ করা । যাহার শিকড় যত গভীর, তাহার শিল্পের বিস্তার তত সুদূর । প্রকৃতির প্রতি সংবেদন, মানুষের প্রতি মমতা এবং সৌন্দর্যের প্রতি দায়বদ্ধতা—এই ত্রিবেণী তাহার শিল্পদর্শনের মূল ভিত্তি। সেই কারণেই তাহার শিল্প কেবল চক্ষুর আনন্দ নহে—ইহা বিবেকেরও জাগরণ। তিনি বিশ্বাস করিতেন, শিল্প মানুষের আত্মাকে পরিশীলিত করে, জাতির মননকে প্রসারিত করে এবং সভ্যতাকে মানবিকতার পথে পরিচালিত করে। শিশুদের হাতে রং ও তুলি তুলিয়া দিয়া তিনি ভবিষ্যতের নন্দনবোধ নির্মাণের প্রয়াস গ্রহণ করিয়াছিলেন । তিনি বিশ্বাস করিতেন, শিল্পী জন্মগত প্রতিভার ফলমাত্র নহে—সৌন্দর্য দেখিবার অভ্যাসও শিল্পসৃষ্টির পূর্বশর্ত। তিনি শিশুদের ছবি আঁকিতে শিখান নাই, দেখিতে শিখাইয়াছেন। প্রকৃতির দিকে, মানুষের দিকে, আলোর দিকে, জীবনের দিকে নূতন করিয়া চাহিবার শিক্ষাই ছিল তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। সুতরাং এই বিদায়ের ক্ষণে আমাদের আত্মপ্রশ্ন করা প্রয়োজন— আমরা কি শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের যথোচিতভাবে সংরক্ষণ করিয়াছি? তাহাদের শিল্পকর্ম, শিল্পভাবনা ও সৃজনঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সযত্নে রক্ষা করিবার দায় কি আমরা পালন করিতেছি? মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধাঞ্জলি হইবে তাহার শিল্পসম্পদ সংরক্ষণ, তাহার নন্দনচিন্তার গবেষণা এবং শিল্পশিক্ষায় তাহার আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করা ।
শিল্পীর মৃত্যু ঘটে; কিন্তু শিল্পের নহে। ক্যানভাসের রং একদিন বিবর্ণ হইতে পারে; কিন্তু যেই সৌন্দর্যচেতনা মানুষের অন্তরে প্রোথিত হয়, তাহা কখনো বিলীয়মান হয় না। মুস্তাফা মনোয়ার সেই অম্লান সৌন্দর্যবোধেরই এক অনির্বাণ প্রদীপ। তাহার তুলির আঁচড়ে যে বাংলাদেশ নির্মিত হইয়াছে, তাহা আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে, নন্দনবোধে এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ে দীপ্তিমান থাকিবে নিঃসন্দেহে ।

