গ্রামীণ জনপদে প্রাকৃতিভাবে জম্ম নেয় নাম না-জানা অসংখ্য বৃক্ষলতা-পাতা। এই বৃক্ষলতা-পাতা আমাদের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে জম্ম নিচ্ছে এবং বেড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে। এদের অনেকগুলোর ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে এবং ভিটামিন পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দেশীয় প্রজাতির গাছগাছালি দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বনায়ন ধ্বংস করে আবাসন তৈরি করা। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণে কাটা হচ্ছে বনজঙ্গল; আবার বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটাতেও বনজঙ্গল কেটে ফসলি জমি তৈরি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ দিয়ে কৃত্রিম বনায়ন করা হচ্ছে ঠিকই, তবে সেটি আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। গাছপালা, পশুপাখি, প্রকৃতি সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আদি অকৃত্রিম যে ইকোসিস্টেম ছিল, সেই ইন্টিগ্রেশনটা ভেঙে গেছে বিদেশ থেকে আসা বনজ বৃক্ষসহ নানা ধরনের উদ্ভিদের চাপে। অর্থাত্ যেসব বৃক্ষ আনা হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে, এগুলো আমাদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত বিদেশি প্রজাতি যেমন: রেইনট্রি, সেগুন, আকাশমণি, আকাশিয়া, শিশু, বাবলা ও ইউক্যালিপ্টাস-জাতীয় গাছের জন্য প্রচুর জায়গার দরকার হয় এবং এগুলো দেশি গাছের তুলনায় অনেক দ্রুততার সঙ্গে বেশি পরিমাণে পুষ্টি মাটি থেকে শুষে নেয়। এছাড়া এগুলো প্রচুর পরিমাণ পানি শোষণ করে আর এসব গাছ তাদের সঙ্গে অন্য প্রজাতির গাছকে বাঁচতে দেয় না বলে দেশীয় প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে বিদেশি ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা এসেছেন। তারা সঙ্গে করে এনেছেন নিজেদের দেশের শস্য, ফল ও লতাগুল্মের বীজ। এ পর্যন্ত এ ধরনের প্রায় ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে তারা আগ্রাসি প্রজাতির উদ্ভিদের তালিকাও তৈরি করেছেন। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে জন্মায় এমন বিদেশি উদ্ভিদের ৬৯টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কচুরিপানা, আসাম লতা, স্বর্ণলতা, লান্টানা বা লণ্ঠন ও বন মটমটিয়ার মতো ব্যাপকভাবে জন্মানো উদ্ভিদ। ফুলের সৌন্দর্যের কথা চিন্তা করে ব্রাজিল থেকে কচুরিপানা নিয়ে আসা হয়। আসাম লতাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর উদ্ভিদ একইভাবে এখানে আনা হয়। আশির দশকে সামাজিক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আকাশমণি, মেহগনিসহ দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়। মূলত কাঠের মূল্য ও দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় এসব বৃক্ষ বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামের সাধারণ মানুষও নিজেদের জমিতে বৃক্ষরোপণ করেন। রাস্তার দুই পাশের সামাজিক বনায়নসহ নানা কর্মসূচিতে এসব বৃক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোলজিতে একটি গবেষণা নিবন্ধতে বলা হয়, বাংলাদেশে উত্পত্তি হওয়া অর্কিডের প্রজাতিগুলোর মধ্যে ৩২টিকে এখন আর এখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত অর্কিডের প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে ১৮৭টি। সে হিসেবে এখানকার ১৭ শতাংশ অর্কিড এখন বিলুপ্ত। বাস্তুসংস্থানে অর্কিডের অনন্য অবস্থান এবং এর ভেষজ, উদ্যানতাত্ত্বিক ও সৌন্দর্যমূল্য বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষতিকে শঙ্কাজনক মনে করছেন গবেষকরা।
সাধারণ ধারণার চেয়ে ৫০০ গুণ দ্রুতগতিতে গাছ বিলুপ্তির ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বিষয়টি সেভাবে মনোযোগ পাচ্ছে না। একটি শতকে বিলুপ্ত হওয়া পশুপাখির সম্পর্কে হয়তো মানুষ মোটাদাগে একটি ধারণা রাখে। কিন্তু গাছের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না। আগ্রাসি প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর ওপরে আলাদাভাবে নানা ধরনের গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণাকে মূল্যায়ন করে একটি সামগ্রিক তালিকা ও চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কারণ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে হলে কোন প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রাণীগুলো আমাদের দেশের পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর, তা জানতে হবে।
বর্তমান সময়ে যত দ্রুত জীবজগতের বিভিন্ন প্রজাতি একের পর এক বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তা অতীতে আর কখনো হয়নি। মানুষ তার জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে চলমান অসংখ্য জীবের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে অনেক প্রজাতিকে নিশ্চিহ্নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগ্রাসি উদ্ভিদের পরিবর্তে দেশীয় প্রজাতির জলপাই, জামরুল, হরীতকী, তেজপাতা, বহেড়া, কদম, শিমুল, বট, হিজল, আম, জাম, লিচু, জাম্বুরা, তেঁতুল, সেগুন, কাঁঠাল, কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদি কাঠ ও ফলফলাদির গাছের দিকে নজর দেওয়া অতি জরুরি। দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতির নিবন্ধন, নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার, উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের সার্বিক সহযোগিতা এবং অবশ্যই স্থানীয় উদ্ভিদের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করাতে হবে যেন ভবিষ্যতে তারা এসব উদ্ভিদ সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশীয় প্রজাতির গাছের উন্নয়নে উদ্যোগ নিলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, পুষ্টি এবং বাস্তুসংস্থান নিশ্চিত হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।