ইন্টারনেটের গতি ও অল্পে সন্তুষ্টি

বাংলাদেশে করোনাকালে মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাইয়াছে। যদিও এই ইন্টারনেটের গতি লইয়া গ্রাহকদের অভিযোগের অন্ত নাই। এই বত্সরের শুরুতে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট স্পিডটেস্টের গ্লোবাল ইনডেক্সে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেটের গতির দিক দিয়া ভারত কিংবা পাকিস্তানের চাইতে পিছাইয়া পড়া দেশের নাম বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু বাংলাদেশের চাইতে কম গতির ইন্টারনেট রহিয়াছে আফগানিস্তানের। এমনকি আফ্রিকার দরিদ্র দেশ বলিয়া পরিচিত ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার চাইতেও খারাপ অবস্থা আমাদের। দেশে বর্তমানে ফোরজি-সেবা চালু রহিয়াছে বলিয়া দাবি করা হয়; কিন্তু বাস্তবে তাহা হইতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাইতেছে না। গত জুলাই মাসে ওকলা নামক একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯টি দেশের মধ্যে ১৩৫তম। এখানে সোমালিয়া, ঘানা, তানজানিয়া ও সুদান আমাদের উপরে রহিয়াছে। অর্থাত্ গ্রাহকরা যে অভিযোগ করিতেছেন, এই সকল পরিসংখ্যান দেখিয়া তাহা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই।

অবশ্য ইহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, গত এক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হইয়াছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসায়-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত—সর্বত্র তথ্যপ্রযুক্তির জয়জয়কার। ইহার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। আবার মোবাইল ফোন ইন্টারনেটের গতি লইয়া প্রশ্ন থাকিলেও বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক। তবে স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে গ্রাহকদের বড় একটি অংশ আজকাল যোগাযোগ, ব্রাউজিং, বিনোদন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মোবাইল ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও ঈর্ষণীয়, বর্তমানে ১১ কোটি ৯ লক্ষ। বিশেষ করিয়া, যাহারা ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন, তাহারা লাইভ স্ট্রিম, ছবি/ভিডিও আপলোড প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের কম গতির কারণে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হইতেছেন। এই মোবাইল ইন্টারনেটের কম গতির বড় কারণ হইল মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর যে পরিমাণে ইন্টারনেট গ্রাহক রহিয়াছে তাহার চাইতে স্পেকট্রাম বা তরঙ্গের পরিমাণ কম। তাই প্রয়োজনীয় গতির ইন্টারনেট-সেবা দিতে হইলে স্পেকট্রামের ঘাটতি দূরীকরণ ও মোবাইল ফোনের টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধির বিকল্প নাই।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে আমাদের খুব অধিক হতাশ হইবার কোনো কারণ নাই। ইন্টারনেট-সুবিধা এখন প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে পৌঁছাইয়া গিয়াছে, ইহা একটি বাস্তবতা। বর্তমানে যেইটুকু সুযোগ-সুবিধা আমরা লাভ করিতেছি, তাহাতে আমাদের কি শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত নহে? ইসলাম ধর্মে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকিতে বলা হইয়াছে। আমরা যে যেই অবস্থায় থাকি না কেন, তাহা সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপার প্রতিফলন। এই জন্য সর্বাবস্থায় তাহার প্রতি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। প্রকৃতপক্ষে অল্পে সন্তুষ্ট আত্মার জন্য প্রশান্তিদায়ক। ইচ্ছা করিলে তিনি ইহার চাইতেও আমাদের খারাপ অবস্থায় রাখিতে পারিতেন। তাই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি হজরত সা’দ ইবনু আবি ওয়াক্কাছ (রা.) তাহার ছেলেকে এই বলিয়া উপদেশ দিয়াছিলেন, ‘হে বত্স! যদি তুমি প্রাচুর্য তালাশ করো, তাহা হইলে অল্পে তুষ্টির মাধ্যমে তাহা অন্বেষণ করো। কেননা অল্পে তুষ্টি এমন সম্পদ যাহা কখনো নিঃশেষিত হয় না।’

এখন আমরা ফোরজির জায়গায় থ্রিজির মতো সেবা পাইলেও আগামী ডিসেম্বরে যখন ফাইভজি চালু হইবে, তখন আমাদের এই সুবিধা আরো বাড়িবে নিঃসন্দেহে। পর্যায়ক্রমে হইলেও এই সুবিধার সম্প্রসারণে আমরা আশাবাদী। আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশা ও স্বপ্ন বাড়াইতে থাকিব, আবার বর্তমান লইয়া একেবারে হা-হুতাশ প্রকাশ করিয়া নিজেদের ক্ষতিসাধন করিব না।