নগরায়ণ, আধুনিকায়ন, শহরভিত্তিক কর্মকাণ্ডে প্রসার ইত্যাদি কারণে গত ২০ বছরে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। উন্নত জীবনযাপন ও চিকিত্সার সুব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রের সহজলভ্যতা ইত্যাদি কারণে গ্রামের চিরাচরিত কৃষিভিত্তিক পরিবার থেকে বিভক্ত হয়ে শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে মানুষ। এতে করে উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করা গেলেও যে ব্যাপারটি আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাচ্ছে, সেটি হলো আবহমান যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় শিশুর মনস্তত্ত্বে বিরূপ প্রভাব।
শহর অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারে স্বামী-স্ত্রী তাদের এক বা একাধিক সন্তান নিয়ে একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। পরিবারের কর্তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাইরে থাকেন, অনেক ক্ষেত্রে তাদের দুজনকেই কাজের প্রয়োজনে সারা দিন বাইরে থাকতে হচ্ছে। এর ফলে বাড়ির ছোট্ট সদস্যদের সারা দিনের সঙ্গী হচ্ছে বাড়ির কাজে সাহায্যকারী অথবা শিশুদের ঠাঁই হয় ডে কেয়ার সেন্টারে। কাজ শেষে ফিরে অভিভাবকদেরও অনেকক্ষেত্রে সেই মাতৃ বা পিতৃসুলভ ব্যবহারটা আর করা হয়ে ওঠে না। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক জগতে। কিন্তু নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে একক পরিবারের গুরুত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না, আবার শিশুর মনস্তত্ত্বের দিকটাও আমরা অবহেলা করতে পারি না। এই পরিস্থিতিতে শিশুর মানসিক বিপর্যয় প্রতিরোধে পরিবারের সদস্যদের এ সংক্রান্ত সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে তা সমাধানে সদয় হতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে যৌথ পরিবার শিশুর মানসিকতার যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়, তা একক পরিবার বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষেই করা সম্ভব নয়। আমরা চাইলে হয়তো যৌথ পরিবারগুলোতে ফেরত যেতে পারব না, কিন্তু চেষ্টা করে কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব, যাতে করে সন্তানের মধ্যে একা বড় হওয়ার ক্ষতিকর দিকগুলোর প্রভাব না পড়ে। সে ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে সন্তানদের প্রতি। সন্তানের জন্য কোয়ালিটি টাইম বের করা খুব দরকার। সন্তানকে সময় দেওয়া মা-বাবা উভয়ের সমান দায়িত্ব। পিতা-মাতাকে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় সন্তানকে দিতে হবে। গল্পের বই পড়ে শোনানো, পিতামাতার ছোটবেলার গল্প থেকে কিছু শেখানোর চেষ্টা করা, স্কুলের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া মা-বাবা উভয়েরই কর্তব্য। এতে সন্তান বুঝবে তার পেশাজীবী মা-বাবার জীবনে তার গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। সাপ্তাহিক ছুটিতে শিশুদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া কিংবা তাদের নিজের বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া ইত্যাদি শিশুর সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে। অন্যদের উপহার দিতে শেখানো, তাদের উপহার ভাগাভাগি করা ইত্যাদি অভ্যাস শিশুদের মন উদার করে।
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরশীলতা, সচ্ছলতা, উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ, উন্নত শিক্ষার সর্বোচ্চ সুযোগ ইত্যাদি ইতিবাচক দিক একক পরিবারের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একক পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুটির মনস্তত্ত্বে যদি সেই ইতিবাচক দিকগুলো প্রতিফলিত না হয়, তবে শিশুদের ভবিষ্যত্ হুমকির সম্মুখীন হয়। একক হোক কিংবা যৌথ, অভিভাবকদের দায়িত্ব সন্তানকে ভালো পরিবেশ দেওয়া, তাদের সঙ্গ দেওয়া। এতে শিশুর মনস্তত্ত্ব ভালো থাকবে, সন্তান হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল থাকবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়