ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির অপব্যবহার

ঘুরেফিরে সব কাজ পায় কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

মুষ্টিমেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যাতে ঘুরেফিরে সব কাজ পেতে না পারে সেই লক্ষ্যে ঠিকাদারের যোগ্যতা বিবেচনায় ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। পুরনো লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের পাশাপাশি নতুনরাও যেন কাজ পেতে পারে—সেই সুযোগ সৃষ্টিই ছিল এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। কিন্তু ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির অপব্যবহারের কারণে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ (ডিএনসিসি) বিভিন্ন দপ্তরের সিংহভাগ কাজ ঘুরেফিরে পেয়ে যাচ্ছে ‘মুষ্টিমেয়’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর তা ঘটছে বিদ্যমান দরপত্র প্রক্রিয়ার নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেই। এতে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন ছোট ও নতুন ঠিকাদাররা।

একই ঠিকাদার একাধিক কাজ করার ফলে কাজের গুণমান নিয়ে যেমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তেমনি নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। ফলে সময়ের ব্যবধানে এখন ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি বাতিলের পক্ষে মত দিচ্ছেন অনেকে।

সওজ ও ডিএনসিসিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি ব্যবহার করে সওজ ঠিকাদারের যোগ্যতা বিচার করে। এ পদ্ধতিতে আগের কাজের অভিজ্ঞতা, সর্বোচ্চ কত টাকায় কাজ করেছেন ও কত বেশি কাজ চলমান আছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে যিনি এসব যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে পারেন, তিনিই কাজ পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অন্য ঠিকাদারদের কাজ পাওয়ার সুযোগ কম।

                                         

কাজের ক্ষেত্রে অধিকতর প্রতিযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সমপ্রতি কিছু প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়াধীন ‘বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)’ এবং ‘সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট ও টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)’। কিন্তু আইএমইডি ও সিপিটিইউর সেসব প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) ভার্চুয়াল বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। ঐ সভায় অভিমত দিয়ে বলা হয় ‘ক্রয়কার্যে অধিকতর প্রতিযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পর্যাপ্ত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ক্রয়কার্যে কতিপয় প্রতিষ্ঠানই পৌনঃপুনিকভাবে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে থাকে যা সমীচীন নয়।’

ঐ সভায় গৃহীত নির্দেশনার আলোকে করণীয় নির্ধারণে বৃহত্ ছয়টি ক্রয়কারী সংস্থা-বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর সাথে গতবছরের ১৭ নভেম্বর একটি সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আইএমইডির সচিব। সভায় ১৩ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে সেই কমিটির সুপারিশসমূহ উপেক্ষিত।

ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিকে কার্যত ‘প্যাড কোটেশন’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে কার কাজের সংখ্যা কত বেশি সেই ভলিউমের ভিত্তিতে প্রায় সব কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট। আর এসব সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের যোগসাজশে। কাজের গোপন চুক্তিমূল্য এবং কত শতাংশ কম হবে সেটিও আগাম হুবহু জানিয়ে দেওয়া হয় পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ফলে ‘নিয়মের’ মধ্যেই সব কাজ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের হাতে। প্রতিযোগী অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো গোপন চুক্তিমূল্য এবং কত শতাংশ কম হবে তা না জানতে পারায় ছিটকে পড়ছে। অথচ ছোটবড় সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যাতে কাজ পায় এবং নির্ধারিত সময়ে যেন কাজ শেষ হয় ও গুণমান ঠিক থাকে সেটি সামপ্রতিক সময়ে একাধিকবার বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির কারণে একদিকে এক প্রকল্পের প্রায় সব কাজই চলে যাচ্ছে একজনের হাতে, অন্যদিকে তিনি আবার নিজে কাজ না করে সেটি-বেশি মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন তৃতীয় পক্ষের কাছে। বেশি টাকায় কাজ নেওয়ায় কাজের মান ঠিক রাখতে পারছে না তৃতীয় পক্ষ। সওজে দীর্ঘদিন যাবত্ ঠিকাদারির সঙ্গে সম্পৃক্তরা জানান, ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিটা সঠিক ছিল। কিন্তু সেটিকে অপব্যবহার করা হচ্ছে। কতিপয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির অপব্যহারের ফলে সিংহভাগ কাজ পেয়ে যাচ্ছে মুষ্টিমেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিকে ‘প্যাড কোটেশন’ বানিয়ে সংখ্যার ভিত্তিতে কার্যত সওজের ৯০ শতাংশ কাজ পাচ্ছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান। কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে সংখ্যা বাড়িয়ে এই চারটি প্রতিষ্ঠান সারা দেশে সওজের সকল কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। কাজ নিয়ে তারা পাঁচ শতাংশ কমিশনে তৃতীয় পক্ষের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে পেশাদার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চারটি প্রতিষ্ঠানের যখন আর কাজের চাহিদা থাকে না, কিংবা তাদের বিট ক্যাপাসিটি থাকে না, কেবল তখনই ১০ শতাংশের মতো কাজ পাচ্ছে প্রকৃত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। একইভাবে ডিএনসিসির সব কাজই পাচ্ছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট।

সওজের প্রতিষ্ঠিত ও পেশাদার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, প্রকৃত কাজের সংখ্যার ভিত্তিতে কেউ কাজ পেলে সেখানে কারো আপত্তি থাকে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্যাড কোটেশনের মাধ্যমে গ্রুপে-গ্রুপে ২০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার কাজও চলে যাচ্ছে চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে কাজের মান সঠিক রাখার সুযোগ কম। তাদের মতে, প্যাড কোটেশন কোনো দরপত্র নয়। এক্ষেত্রে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ও থাকে না। অথচ গণপূর্ত অধিদপ্তর ও এলজিইডিসহ অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ম্যাট্রিক্সের বদলে এলটিএম (লোকাল টেন্ডার মেথড) পদ্ধতিতে ফিরছে।

এবিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সবুর ইত্তেফাককে বলেন, ‘চার/পাঁচ বছর ধরে ম্যট্রিক্স পদ্ধতি চলছে। আইন অনুযায়ীই এটা হচ্ছে। সবাই তো আর সব জায়গায় কাজ পাবে না।’ তিনি জানান, সংশোধিত শর্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো উন্নয়নকাজের একটি প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ৩৫ কোটি টাকার বেশি হলে সেক্ষেত্রে আর ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি থাকছে না। আর রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ক্ষেত্রে ১৫ কোটি টাকার বেশি হলে উন্মুক্ত দরপত্রে যাওয়া হচ্ছে।

ম্যাট্রিক্স পদ্ধতির অপব্যবহারের কারণে উপেক্ষিত হচ্ছে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (পিপি) আইন-২০০৬’ এবং ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০০৮’। সরকারি অর্থে পণ্য, কার্য ও সেবা ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ক্রয় প্রতিযোগিতায় অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিতে প্রায় সব কাজ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাওয়ায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অকার্যকর হতে চলেছে। এছাড়া গতবছরের ২৮ অক্টোবর পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালায় সংশোধনীর প্রস্তাবেও কার্যক্রয়ে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত দরপত্র প্রতিযোগিতায় একাধিক মূল্যায়িত সর্বনিম্ন দরপত্রদাতার উদ্ধৃত দরে সমতার ক্ষেত্রে সফল দরদাতা নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এসএ