বিশ্বে এই যাবত্কালের অন্যতম বৃহত্ আর্থিক দলিলপত্র ফাঁসের এক ঘটনায় বিশ্বের বড় বড় রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরের গোপন সম্পদ ও লেনদেনের তথ্য বাহির হইয়া আসিয়াছে। ‘প্যান্ডোরা পেপার্স’ নামক এই সকল দলিলপত্রে প্রায় ৩৫ জন বর্তমান ও সাবেক নেতা এবং তিন শতাধিক সরকারি কর্মকর্তার নাম রহিয়াছে, যাহারা বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে জড়িত। প্যান্ডোরা পেপার্সের পূর্বে গত সাত বত্সরে প্যারাডাইস পেপার্স, পানামা পেপার্স ইত্যাদি নামক দলিলপত্র ফাঁস হইয়াছিল, যেইখানে বিশ্বের বড় বড় রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও গোপন সম্পদের কথা উঠিয়া আসিয়াছিল। যদিও এই সকল দলিলপত্রে যাহাদের নাম খুঁজিয়া পায় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলি, তাহাদের সকলের কথা প্রকাশ করা হয় না বলিয়া সমালোচনা রহিয়াছে। তথাপি এই সকল ফাঁস হওয়া দলিলপত্র হইতে যেই বিষয়গুলি সূর্যালোকের ন্যায় স্পষ্ট হইয়া উঠে, তাহা হইল ধনসম্পদ ও অর্থের প্রতি মানুষের সীমাহীন প্রতিযোগিতা আর নিজের যাহা রহিয়াছে তাহাতে সন্তুষ্ট না থাকিয়া সম্পদের পাহাড় গড়িবার আকাঙ্ক্ষা।
বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মেই অল্পতে সন্তুষ্ট হইবার কথা বলা হইয়াছে। ইহা সকল প্রকার লোভ-লালসা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং অবৈধ পন্থায় আয়-উপার্জন করিয়া ধনসম্পদ গড়িয়া তোলা হইতে মানুষকে বিরত থাকিতে অনুপ্রাণিত করে। ইসলামের দৃষ্টিতে কেহ যদি হালাল পথে অল্প রিজিকে সন্তুষ্ট হইয়া থাকেন, তাহা হইলে আল্লাহতায়ালাও তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া যান। হাদিসে ইরশাদ হইয়াছে, মহানবি হজরত মুহম্মদ (সা.) বলিয়াছেন, ‘যেই বান্দা আল্লাহর পক্ষ হইতে অল্প রিজিক পাইয়া খুশি থাকে, আল্লাহতায়ালা তাহার তরফ হইতে অল্প আমলে খুশি থাকেন।’ নিজের সম্পদ কমবেশি যাহাই হউক, তাহাতে যাহারা তৃপ্ত থাকেন, দুনিয়ার জীবন হইয়া উঠে তাহাদের জন্য অনেক বেশি সুখকর। অল্পে তুষ্টি কিংবা তৃপ্ত থাকিবার এই গুণটিকে আরবিতে বলা হয় ‘কানাআত’ যাহা মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। ইহা হইতে আমরা বুঝিতে পারি, সমাজ তথা রাষ্ট্রে যে যেই অবস্থায় রহিয়াছি সেই অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। তবে ইহাও সত্য মানুষের প্রয়োজনের কোনো শেষ নাই, চাহিদারও অন্ত নাই। মানুষের এই চাহিদা নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতেও সীমাবদ্ধ নহে। আর মানুষ এই সকল চাহিদা পূরণের নিমিত্ত অধিক সম্পদ উপার্জনের লক্ষ্যে নানা পন্থা অবলম্বন করিয়া থাকে। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, ধনসম্পদ উপার্জনের জন্য অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিয়া কিংবা নিজের প্রয়োজনমাফিক যতটুকু দরকার তাহাতে সন্তুষ্ট না হইয়া অবৈধ পন্থা অবলম্বন করিলে তাহার পরিণতি শুভ হয় না।
বস্তুত একজন সম্পত্শালী ব্যক্তি যখন আরো সম্পদের নেশায় অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন, নিজের সম্পদকে অন্যের সম্পদের সঙ্গে তুলনা করিয়া থাকেন, তিনি কখনোই মানসিকভাবে সুখী হইতে পারেন না। সমাজের চোখে তিনি যতই বিত্তশালী হউন না কেন, হূদয়ের বিচারে তিনি সচ্ছল নহেন। তবে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইহার বিপরীত উদাহরণও খুঁজিয়া পাওয়া যায় বইকি। অনেকেই রহিয়াছেন, যাহারা ক্ষমতা ও অর্থের কাছাকাছি থাকিয়াও নিজের যাহা রহিয়াছে তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করেন না। সুতরাং আমাদের সকলেরই ভাবিতে হইবে, ধনসম্পদ, অর্থবিত্ত উপার্জনের জন্য আমরা কাহার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতেছি? আমাদের যাহা রহিয়াছে তাহাতেই কি সন্তুষ্ট হওয়া যাইত না? আত্মতুষ্টিই জগত্সংসারে সুখী হইবার মূল নিয়ামক শক্তি। নিজের সীমা নিজেকে বুঝিতে হইবে।