হলের দুয়ার খুলল

করোনা সংক্রমণ বাড়ায় গত বছরের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ক্যাম্পাস খোলার প্রতীক্ষায় ছিল শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ দেড় বছর পর তাদের সে প্রতীক্ষার অবসান হলো। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক চতুর্থ বর্ষ ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির জরুরি সভায় আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম (সব বর্ষের ক্লাস-পরীক্ষা) শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ১০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম, ২য় ও ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। 

প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবদুর বাছির বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ১ম, ২য় ও ৩য় বর্ষের যেসকল শিক্ষার্থী অন্তত ‘কোভিড-১৯’-এর প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছে, তারা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে এবং টিকা গ্রহণের কার্ড/সনদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ পরিচয়পত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে নিজ নিজ হলে প্রবেশ করতে পারবে।

গতকাল যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি              ও নিয়মকানুন অনুসরণ করে উত্সবমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে নিজ নিজ হলে উঠায় সভায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এই শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট, বিভিন্ন হোস্টেলের ওয়ার্ডেন এবং প্রক্টরগণ উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষার্থীদের দ্রুত টিকা প্রদানের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রাপ্তির জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে টিএসসিতে ভোটার রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রভোস্ট কমিটির সভায় জানানো হয়। যেসকল শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র নেই তারা এই কেন্দ্র থেকে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে দ্রুত এনআইডি করতে পারবে।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়, অন্তত এক ডোজ টিকা নেওয়ার প্রমাণপত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সাপেক্ষে স্নাতক চতুর্থ বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা ৫ অক্টোবর হলে উঠতে পারবে।

হলে হলে  যেভাবে শিক্ষার্থী বরণ

গতকাল সকাল ৮টায় হলগুলোর প্রাধ্যক্ষগণ শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। এসময় শিক্ষার্থীদের টিকার কার্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দেখাতে হয়েছে। দীর্ঘদিন পর হলে প্রবেশ করতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় তাদের। সকাল ১০টায় বিজয় একাত্তর হল পরিদর্শন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আাাখতারুজ্জামান। এ সময় তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের জন্য খুব আনন্দের দিন। মনে হচ্ছে যেন ঈদের দিন! যেভাবে আন্তরিকতার সাথে প্রতিটি হল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিচ্ছে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে সবাই উঠছে, এটা আমাদের জন্য আনন্দদায়ক।’ 

সকাল থেকেই নিজ নিজ হলে উঠেছেন অনার্স চতুর্থ বর্ষ ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফুল, চকলেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সম্বলিত মাস্ক দিয়ে তাদের বরণ করে নিয়েছে হল কর্তৃপক্ষ। এর আগে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন বাহনে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলো ট্রাংক, বাক্স ও ব্যাগে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। প্রতিটি হলের সামনে সকাল আটটার আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের ভিড় জমতে শুরু করে। হলে ঢোকার পর ভেতরের চায়ের দোকানে আড্ডায় মেতে ওঠেন অনেকে। এদিকে প্রতিটি হলে বসানো হয়েছে হাত ধোয়ার বেসিন। হলের দেয়ালগুলো চুনকাম ছাড়াও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজও শেষ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হলগুলোতে গণরুম বন্ধ রেখেছে।

দেড় বছর পর হলে উঠতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা। সহপাঠীদের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করমর্দন ও সৌজন্য বিনিময় করেছে। শামসুন্নাহার হলের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী জেবা আনিকা বলেন, ‘মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একটু শঙ্কায় ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় খোলা নিয়ে। দীর্ঘদিন পর সেই শঙ্কা ঘুচেছে। প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। আজকে হল খোলা পেয়ে আনন্দ লাগছে।’ 

বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড, টিকা কার্ড দেখে তাদের আমরা বরণ করে নিয়েছি। শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে হলে প্রবেশ করেছে। কোথাও কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, ফুল ছিটিয়ে শিক্ষার্থীদের বরণ করে হল কর্তৃপক্ষ। এসময় তাদের মিষ্টি মুখ করা হয়। উপহার দেওয়া হয় দুটি মাস্ক, একটি কলম ও রজনীগন্ধা ফুল। হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রাণ। আজ তাদের আগমনে আবারও প্রাণোচ্ছল হলো হল প্রাঙ্গণ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।’

এদিকে হলে হলে ছাত্রদের বরণ করে নিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হল শাখার নেতৃবৃন্দ। সকাল থেকেই সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংশ্লিষ্ট হলের সামনে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিক্ষার্থীরা আসলে হাতে ফুল দিয়ে তাদের বরণ করে নেন তারা।

মানতে হবে যেসব নির্দেশনা

১. হলের কক্ষের বাইরে আসলে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মিত ও সার্বক্ষণিক সঠিক নিয়মে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরিধান করতে হবে। ২. স্বাস্থ্যবিধি পালনে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পরস্পরের কাছ থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ৪. কক্ষের মেঝেতে শোয়া যাবে না, এক বিছানায় একাধিক ব্যক্তি শুতে পারবে না। কেবলমাত্র আবাসিক ও দ্বৈতাবাসিক শিক্ষার্থীরা হলে অবস্থান করতে পারবে। কোনো বহিরাগত কক্ষে অবস্থান করতে পারবে না। ৫. প্রয়োজন সাপেক্ষে কক্ষে এবং কক্ষের বাইরে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ৬. শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ কক্ষ এবং কক্ষের আশপাশ সবসময় নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার রাখতে হবে। এক্ষেত্রে হল প্রশাসন সহযোগিতা প্রদান করবে। ৭. হল ডাইনিং, ক্যান্টিন, মেস, দোকান, সেলুন, রিডিংরুম, অডিটোরিয়াম, টিভিরুম, অতিথি কক্ষ, পাঠাগার, মসজিদ ও উপাসনালয়ে ভিড় করা যাবে না। এসব স্থানে শারীরিক দূরত্ব বিধি অনুসরণ এবং মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ডাইনিং-এ পালাক্রমে খাবার খেতে হবে। ৮. পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অতিথি কক্ষে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ বন্ধ রাখতে হবে। বেড়াতে ও ঘুরতে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সভা-সমাবেশ, রেস্তোরাঁ, পার্টি ও গণপরিবহন এড়িয়ে চলতে হবে।