সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে যুবক রায়হান আহমেদকে নির্যাতন করে হত্যা করেন এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া। এ মামলায় কারাগারে আছেন তিনি। তাকেসহ ছয় জনকে অভিযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে আদালতে চার্জশিট। সেই চার্জশিট গ্রহণ করেছে আদালত। এমতাবস্থায় মামলার বিচার ও শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচাতে নতুন ফন্দি এঁটেছেন বরখাস্তকৃত সেই এসআই আকবর। ইতিমধ্যে ভিকটিম রায়হানের স্ত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এমনকি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে চেয়েছেন। কিন্তু হত্যা মামলার প্রধান আসামির ঐ প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহত রায়হানের পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ হেফাজতে রায়হানের নিহতের ঘটনায় মামলার প্রধান আসামির এমন প্রস্তাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে সিলেটসহ দেশ জুড়ে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযুক্ত এসআই আকবর যদি নিহত রায়হানের স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন, তাহলে তা মামলার বিচারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। কারণ এই মামলায় রায়হানের স্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন। যখনই বিয়ে করবেন, তখন সেই সম্পর্কের প্রভাব পড়বে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে। সেজন্য চতুর ঐ পুলিশ সদস্য এ ধরনের অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন, যাতে তিনি শাস্তির হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, নিজেকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর লক্ষ্য হিসেবে এই কৌশল নিয়েছেন আকবর। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী বলেন, নিহতের স্ত্রীকে বিয়ের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটাতে যদি আসামি সফল হন, তাহলে মামলা দুর্বল হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঐ আসামি নিহতের পরিবারের সদস্যদের ভারণপোষণের দায়িত্ব নিতে চান। কারণ এতে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি উনি ঘটিয়েছেন। এ ধরনের প্রস্তাবেরও একটি সাক্ষ্যগত মূল্য রয়েছে।
রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, ‘কিছুদিন আগে পুলিশের এক সদস্য আমাদের বাসায় আসেন। তিনি আরেকটি মামলায় কারাগারে ছিলেন। সেখানে আকবরের সঙ্গে তার দেখা হয় জানিয়ে ঐ পুলিশ সদস্য বলেন, আকবর রায়হানের স্ত্রীকে বিয়ে করতে চান এবং আমার ও আমার নাতনির ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে চান। আমি তার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আদালতে আসার পর সে আমার কাছে পা ধরে মাফ চেয়ে সমঝোতারও প্রস্তাব দেয়।’
রায়হান হত্যার ঘটনায় পুলিশের বিভাগীয় মামলায় সাক্ষ্য দিতে গত মাসে রায়হানের মা সালমা বেগম, স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী ও সত্বাবা হাবিবুল্লাহকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারা ফটকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় আকবরসহ অন্য আসামিদেরও তাদের সামনে হাজির করা হয়। সালমা বেগম বলেন, ‘ঐ দিন আকবর আমার ও রায়হানের চাচার (সত্বাবা) পা ধরে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেন। তিনি ক্ষমা চেয়ে আমাদের তার প্রাণ ভিক্ষা দেওয়ার জন্য বলেন। আমাদের সব ধরনের দায়িত্ব তিনি নেবেন বলেও জানান।’ রায়হানের মা বলেন, “সেদিন আকবর আমাকে বলেছিল, ‘আমরা ভুল তথ্য পেয়ে রায়হানের মতো ভালো একটি ছেলেকে নির্যাতন করেছি। আমাদের ভুল হয়েছে। আমরা বুঝতে পারিনি। আমাদের ক্ষমা করে দিন।’”
সালমা বেগম বলেন, ‘আমার নিরপরাধ ছেলেকে সে খুন করেছে। তাকে আমি কখনোই ক্ষমা করব না। আমাদের ভরণপোষণের চিন্তা করতে হবে না। পারলে সে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিক।’ তিনি বলেন, ‘রায়হানের শিশুসন্তান সব সময়ই বাবাকে খোঁজে, কিন্তু পায় না। তার জন্য বুক ফেটে যায়। এই শিশুকে যে এতিম করেছে, তাকে কী করে ক্ষমা করব?’
২০২০ সালের ১১ অক্টোবর রাতে সিলেট নগরের আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভোরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে। সেখানে সকালে তিনি মারা যান। রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন।