দুর্গোত্সবের সেকাল ও একাল

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ পূজা। পুরাণশাস্ত্রমতে, দুর্গাদেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া, উমা, চণ্ডী, ভগবতী, পার্বতী, কাত্যায়নী, মহিষাসুরমর্দিনী, শিবানী, ভবানী, অম্বিকা, অদ্রিজা প্রভৃতি নামে পূজিত হন। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কালিকাপুরাণ, দেবীপুরাণ, দেবী ভগবত প্রভৃতি গ্রন্থে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও দেবী দুর্গার কাহিনি ও লীলার বর্ণনা পাওয়া যায়।

দুর্গাপূজার সূচনা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের শাসনামলে প্রথম পূজা শুরু হয়। রাজশাহীর তাহিরপুরের জমিদার বাংলার ‘বারোভুঁইয়া’র অন্যতম কংস নারায়ণ তার মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে দুর্গাপূজার প্রথম আয়োজন করেন। ধীরে ধীরে বাঙালি জমিদারদের মধ্যে এই দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়। পূজা ও অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় হতো বলে প্রথম দিকে মূলত রাজা বা জমিদারদের মধ্যেই দুর্গাপূজার আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রথম থেকেই দুর্গাপূজায় সবর্জনীনতা ছিল। এ পূজা উপলক্ষ্যে সাধারণ মানুষ রাজা ও জমিদারবাড়ির কাছাকাছি আসার সুযোগ পেত। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সমাজ থেকে রাজা-প্রজার ভয় ও দূরত্ব কমে আসতে শুরু করে। বাঙালি সামাজিক সম্প্রীতির সূচনাতে দুর্গাপূজার বড় ভূমিকা ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর রাজা নবকৃষ্ণদেব লর্ড ক্লাইভের সন্মানে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে  দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উত্সবের আয়োজন করেছিলেন। দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্দেমাতরম’ গানটি রচনা করেছেন—যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল।

ঢাকা শহরে নবাব সলিমুল্লাহর শাসনামলে ১৮৩০ সালে সূত্রাপুরের ব্যবসায়ী নন্দলাল মৈসুণ্ডির বাড়িতে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু হয়। দুর্গাপূজা বিংশ শতক পর্যন্ত পারিবারিক ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কলকাতায় ১৯১০ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বারোয়ারি পুজোর শুরু হয়। তবে এ অঞ্চলে ১৯৪৭ সালের পরে অভিজাত ও বিত্তশালী হিন্দুদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে শুরু করলে তখন থেকে সর্বজনীন পূজা ব্যাপক আকারে শুরু হয়। এর ফলে হিন্দু সমাজের সব বর্ণের মানুষদের সম্মিলিতভাবে পূজা করার প্রচলন শুরু হয়। সম্মিলিত পূজাকেই বলে বারোয়ারি বা সর্বজনীন পূজা। তবে সমাজে পারিবারিক ও বারোয়ারি দুই ধরনের পূজার প্রচলন আছে।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হলেও বিভিন্ন সময়ে এর ছন্দপতন ঘটেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি হিন্দুদের জীবনে নেমে এসেছিল অভিশাপ। তখনকার সময়ে হিন্দু হলেই নেমে আসত অবর্ণনীয় অত্যাচার। রমনা কালীমন্দির, ঢাকেশ্বরী মন্দির, শাঁখারীবাজারের মন্দির, চট্টগ্রামের কৈবল্যধাম মন্দিরসহ হাজার হাজার মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদাররা। স্বাধীনতার পরও বারবার দুর্গাপূজার ওপর আঘাত এসেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার ফলে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের সংবিধানকে পরিবর্তন করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের প্রতি যে নির্মম অত্যাচার করা হয়েছিল তার প্রতিবাদে সে বছর কালো কাপড় দিয়ে মণ্ডপকে ঢেকে পূজা করা হয়েছিল।

তবে আশার কথা হলো, যখনই স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে তখনই ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের পূজাপার্বণ নির্বিঘ্নে ও আনন্দঘন পরিবেশে করতে পেরেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে প্রতি বছরই পূজার সংখ্যা গাণিতিক হারে বেড়েই চলছে। গত বছর সারা দেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার ২১৩টি। এবার এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১১৮টিতে, যা গত বছরের চাইতে ১ হাজার ৯০৫টি বেশি। আর ঢাকা মহানগরে পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২৩৮টি, যা গত বছর থেকে চারটি বেশি। এছাড়াও বাংলাদেশে আরো হাজার হাজার পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা হয়ে থাকে। গত বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিলেন, এ বছর সেটি বৃদ্ধি করে ৩ কোটি করেছেন। এভাবে প্রতি বছরই অনুদান বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা সার্বজনীন উত্সবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে, প্রত্যেক ধর্মবিশ্বাসীদের আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হলেও উত্সবের আলাদা কোনো রং নেই। এই উত্সবে শামিল হন সব ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশার মানুষ।

আমাদের দেশে সুপ্রাচীনকাল থেকে ধর্মীয় উত্সবের আনন্দ ভাগাভাগিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে শামিল হওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঈদ, পূজা, বড়দিন ও বৌদ্ধ পূর্ণিমার ধর্মীয় আচার ভিন্ন হলেও উত্সবের আনন্দ এক ও অভিন্ন। দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উত্সব হলেও কালের পরিক্রমায় আজ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক বাঙালির উত্সবে পরিণত হয়েছে।

n লেখক :সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা