বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা বিশ্বব্যাপী। তাই মা ইলিশ রক্ষার বিকল্প নাই। চলছে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান। ইলিশ প্রজনন মৌসুম ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর—এই ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা, বিক্রি ও মজুত নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তারপরও থেমে নেই ইলিশ ধরা। এই জেলেরা কি রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর?
পৃথিবীর মোট উত্পাদনের অর্ধেকেরও বেশি ইলিশ আমাদের দেশে উত্পাদন হয়। ইলিশ বাস করে সমুদ্রে। কিন্তু ডিম পাড়ে নদীতে এবং ডিম পাড়ার জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে সমুদ্র থেকে নদীতে আসে। অর্থাত্ মিঠা পানিতেই বাচ্চা ফোটে। নদী এবং নদীর মোহনা হলো ইলিশের প্রাকৃতিক হ্যাচারি। পদ্মা-মেঘনা-যমুনাকে বলা হয় ইলিশের আঁতড়ঘর। আমাদের নদীগুলো ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত। ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মা ইলিশ এবং ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা যাবে না। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই একটা নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্রে এবং নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। নির্বিচারে মা ইলিশ এবং জাটকা আহরণ ও নিধনের ফলে এর উত্পাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সে কারণে মত্স্য সংরক্ষণ আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, ইলিশের অভয়াশ্রম নির্ধারণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা ও জাটকা নিধন বন্ধ করার কর্মসূচিকে জোরদার করতে হবে। প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি দূর করতে ইলিশ উত্পাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, কর্মসংস্থানে, দারিদ্র্য মোচনে এবং প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি দূর করতে মত্স্যখাতের উন্নয়ন অপরিহার্য।
ইলিশকে বলা হয় আমাদের দেশের সিলভার গোল্ড। ইলিশ রক্ষা করতে না পারলে আমাদের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও বাড়বে। অর্থনীতিতেও পড়বে এর বিরূপ প্রভাব। মা ইলিশ রক্ষা করতে পারলে রাষ্ট্রের যতটা না লাভ তার অনেক অনেক গুণ বেশি লাভ জেলেদের। ইলিশের উত্পাদন বাড়াতে হলে নদীতে জেগে ওঠা ডুবো চর ও ভাসমান চরগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে খনন করতে হবে। আর এতে শুধু ইলিশ উত্পাদনই বাড়বে না, রোধ হবে নদীভাঙনও। ইলিশ অনেক দ্রুতগতিসম্পন্ন মাছ। এরা সমুদ্র এবং নদীতে দল বেঁধে চলে। এরা যে গতিতে সামনে যায় এবং চলার পথে বাধা পেলে তার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে পিছনের দিকে ছোটে। ডুবো চর এবং ভাসমান চরের কারণে নদীতে ইলিশের উত্পাদন কমে যাচ্ছে। নদীদূষণ এবং নদী দখল ইলিশসহ মিঠা পানির অন্যান্য মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় বাধা। সেজন্য নদীদূষণ রোধ এবং নদীকে দখলমুক্ত রাখতে হবে। তাহলেই ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে চক্রবৃদ্ধি হারে।
আমার বাড়ি চাঁদপুরের মেঘনার পাড়ে। যেটা ইলিশের বাড়ি বলে খ্যাত। মৌসুম ছাড়াও এখানে সবসময়ই সুস্বাদু ইলিশ পাওয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এবার ভরা মৌসুমেও চাঁদপুর, হাইমচরের মেঘনা ছিল অনেকটাই ইলিশশূন্য। এই মৌসুমে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে ইলিশের স্বাদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হয়েছে ইলিশের আকার এবং এর আকাশচুম্বী দামের কারণে। এর প্রধান কারণ দুটি। এক. জাটকা রক্ষার অভিযানে ব্যর্থতা এবং দুই. মেঘনাতে প্রচুর ডুবোচর। এই ডুবোচরের কারণে জালের প্রবাহ কম থাকায় ইলিশের বিচরণও কম। সামাজিক আন্দোলন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও অবস্থান, আইনের সঠিক প্রয়োগ, ডুবোচর খনন এবং সচেতনতার মাধ্যমে মা ইলিশ ও ডিমওয়ালা ইলিশ রক্ষার অভিযান সফল এবং ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
চাঁদপুর