সাক্ষাত্কারে জেনে নিই কমনওয়েলথ

স্কলারশিপে আবেদনের যোগ্যতা  প্রক্রিয়া ও অন্যান্য

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ অর্জন করেছেন দু’বার। ২০০৯ সালে মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করতে শাবিপ্রবির প্রথম কোনো গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়ে ইংল্যান্ডের লিডস মেটের স্কুল অব এপ্লাইড গ্লোবাল ইথিক্স এর পিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে মেরিটসহ মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে ২০১২ সালে আবারো কমনওয়েলথ স্কলারশিপ অর্জন করেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ এর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পিএইচডি গবেষণার জন্য। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে ২০২২ সালের জন্য কমনওয়েলথ বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইউজিসি। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তি নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করতে পারবেন। আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে ইউজিসি বরাবর আবেদন করতে হবে। আজ তাঁর কাছে আমরা জানবো এ বছরের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ সম্পর্কে বিস্তারিত। 

কমনওয়েলথ

স্কলারশিপ সম্পর্কে  জানতে চাই

ড. জহিরুল হক: কমনওয়েলথ স্কলারশিপ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক স্কলারশিপগুলোর মধ্যে একটি। যুক্তরাজ্য সরকার বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি তথা গবেষণাকে উত্সাহিত করতে বিশাল তহবিলের সংস্থান করে। তন্মধ্যে কমনওয়েলথ স্কলারশিপের আওতায় বিশ্বের কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহ বিশেষতঃ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহ থেকে মেধাবী ও কৃতি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যের প্রথমসারীর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অধ্যয়ন ও গবেষণার সুযোগ করে দেয়।  ১৯৬০ সালে সারা বিশ্বের ১৭৫ জন মেধাবী ও কৃতি শিক্ষার্থী ও গবেষককে এ বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়ে এযাবত প্রায় ২৮ হাজার বৃত্তির সংস্থান করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। পিএইচডি ও ১ বছর মেয়াদী মাস্টার্স কোর্সের জন্য এ বৃত্তি প্রদান করা হয়। এছাড়া একাডেমিক স্টাফ স্কলারশিপ, কমনওয়েলথ শেয়ারড স্কলারশিপ, সি্প্লট-সাইট, ডিসট্যান্স লার্নিং ও প্রফেশনাল ফেলোশিপও প্রদান করে থাকে। কমনওয়েলথভুক্ত উন্নত দেশসমূহ তথা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মেধাবীরাও এ বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হন। তবে অনুন্নত, স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহ যাতে বেশি স্কলারশিপের আওতায় আসতে পারেন সেজন্য উন্নতদেশসমূহকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকরা অনুন্নত, স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহের প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করবেন।

 

কমনওয়েলথ স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া ও তাদের কীভাবে নির্বাচন করা হয়?

 

ড.জহিরুল হক:প্রতিবছর সিএসসি ওয়েবসাইটে এ বৃত্তির জন্য আবেদন আহবান করা হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজ করতে ও প্রতিটি সদস্য দেশের মেধাবীরা যাতে এ বৃত্তির জন্য মনোনীত হতে পারেন সেজন্য সদস্য দেশসমূহের জন্য পৃথক নমিনেটিং এজেন্সি রয়েছে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) নমিনেটিং এজেন্সি হিসেবে প্রাথমিক আবেদন আহবান, প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচন করে মনোনীত প্রার্থীদের আবেদন ফরম লন্ডনস্থ সিএসসি কার্যালয়ে পাঠায়। পরে সিএসসির একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন রয়েছে যারা নৈর্বক্তিকভাবে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ইংরেজি দক্ষতা (আইইএলটিএস স্কোর), শিক্ষাবহির্ভূত যোগ্যতা, গবেষণা প্রস্তাবনার মান, এসওপি বা স্ট্যাটমেন্ট অব পারপাস, কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রী অর্জন শেষে প্রত্যাশিত বৃত্তিপ্রাপ্তদের ক্যারিয়ার প্ল্যান, সেই ডিগ্রীর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সদস্যদেশ বা যুক্তরাজ্য কীভাবে সুফলভোগ করবে, প্রভৃতির উপর ভিত্তি করে মনোনয়ন দিয়ে আবেদন পত্র প্রার্থীর কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত বিভাগ বা ডিসিপ্লিনে পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে নিঃশর্ত ভর্তির নিশ্চয়তা পেলে প্রার্থী তালিকা প্রণয়ন করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত প্রার্থীদের নির্ধারিত ফরম পাঠানো হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফল ভালো হলে সবকিছু বিবেচনা সাপেক্ষে চূড়ান্ত মনোনীতদের এওয়ার্ড লেটার পাঠানো হয়। স্থানীয় ব্রিটিশ কাউন্সিল সিএসসির পক্ষে পরবর্তী কার্যক্রম তথা নির্বাচিত স্কলারদেরও তাদের পরিবারের ভিসার ব্যাপারে সহায়তা, এয়ার টিকিটের ব্যবস্থা করা, যুক্তরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা, আইন-কানুন, আবহাওয়া ও জীবন যাপন সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য কর্মশালার আয়োজনসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ১ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়।

 

বাংলাদেশী মেধাবীদের আবেদনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া কী এবং এ বছর আবেদনের শেষ সীমা কবে?

 

ড. জহিরুল হক: মাস্টার্স ডিগ্রীর জন্য অনার্সে দ্বিতীয় শ্রেণী ও তার ওপরে থাকতে হবে আর পিএইচডির জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে দ্বিতীয় শ্রেণী ও তার ওপরে থাকতে হবে। গ্রেডিংসিস্টেমে সমমানের সিজিপিএধারীরা আবেদন করতে পারবেন। তবে যেহেতু এটি একটি তীব্র ্রপ্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ বৃত্তি তাই কয়েক হাজার আবেদন জমা হয়। পরে ইউজিসি প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে শর্ট লিস্ট করে। আর শর্ট লিস্টে দেখা যায় বেশি সিজিপিএ বা এ মাইনাস বা এ গ্রেড প্রাপ্তরাই তালিকাভূক্ত হন। যেকোনো বিষয়ের অনার্স ডিগ্রীধারীরা আবেদন করতে পারেন। তবে প্রতিবছর যুক্তরাজ্য সরকার কিছু অগ্রাধিকার বিষয় নির্ধারন করে দেয়। প্রার্থীদের সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আবেদন করা প্রয়োজন। এবারের অগ্রাধিকার হচ্ছেঃ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট; স্ট্রেনদেনিং হেলথ সিস্টেম অ্যান্ড ক্যাপাসিটি; প্রমোটিং গ্লোবাল প্রসপারিটি; স্ট্রেনদেনিং গ্লোবাল পিস, সিকিউরিটি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স; স্ট্রেনদেনিং রিজেলিয়েন্স অ্যান্ড রেসপন্স টু ক্রাইসিস; এবং অ্যাকসেস, ইনক্লুশন অ্যান্ড অপরচুনিটি। সে হিসেবে বাংলাদেশের সরকারি ও বে-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ যেসব বিষয়ে ডিগ্রী দেন তার সবাই আবেদন করতে পারবেন। আমার এক অনুজ নাটকের উপর পিএইচডি স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। সেটা প্রমোটিং গ্লোবাল প্রসপারিটি বা স্ট্রেনদেনিং গ্লোবাল পিস এন্ড সিকিউরিটিতে পড়ে। এমনকি বাংলা বা সংস্কৃত বা ইসলামী শিক্ষা বা ইসলামের ইতিহাস থেকেও যদি কেউ পাস করেন আর তিনি ঐ অগ্রাধিকার বিষয়ের যে কোনো একটি বিষয়ের জন্য নিজের উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য বিবেচনা করেন তাহলে তিনিও আবেদন করতে পারেন। এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রীধারীরাও আবেদন করতে পারবেন তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য।     

 

ড.জহিরুল হক শাকিল