স্বস্তি। কেবল স্বস্তি। আকাশে সংশয় নেই। মেঘচিহ্ন নেই। সকালে, দিনভর, রাতভর সব সংশয়, জলবায়ুর পূর্বাভাস উড়িয়ে দিয়ে আকাশ আকাশের মতোই ভরসা জোগাচ্ছে, বেরিয়ে পড়ো। ছড়িয়ে দাও নিজেকে। গুঁড়িয়ে দাও ভয়জাগানিয়ার বিভ্রান্তিকে। হ্যাঁ, দল বেঁধে আমরা বেরিয়ে পড়ব। গান করব। নাচব। মুখোশে মুখ ঢেকে মুখোশকেই বিদ্রুপ করব। পুজো এলেই নস্টালজিয়া আর একধরনের সুনন্দ প্রেম আমাদের পেয়ে বসে, যা সমষ্টিকতা আর ব্যক্তিকতার ঊর্ধ্বে। নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই এর। নেই বলেই রহস্যময় স্পর্শের মতোই প্রতি বছর অচেনা, অবলা উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে।
এবার পুজোর মেজাজ একটু আলাদা। দুই বছর জুড়ে উত্সবের দমবন্ধ, রুদ্ধ হাওয়া ছিল, স্বতঃস্ফূর্ত মেজাজ ছিল না। কারণ কি শুধু মহামারির হামলা? তা নয়। পূজা হবে কি হবে না—এ সংশয় ছিল। ভয় ছিল। মৃত্যুর হুমকি ছিল। জনতা ভয়কে যথাসম্ভব সামাল দিয়ে, রুখে দিয়ে নিরন্তর লড়াই করেছে। এখানেই সম্মিলিত স্বর আর শুভবুদ্ধির জয়।
এবারের পুজোর গুণগত, সংখ্যাগত মূল্য তাই আলাদা। দ্বিতীয়ত, স্বপ্নপ্রসূত অথবা জাগিয়ে তোলা হঠাত্ আসা ধন যখন ব্যক্তিচিন্তায়, আবেগের নির্মাণে অথবা সৃষ্টিতে রসদ জোগায়, অভয় দিয়ে বারবার শুনিয়ে যায়—দুর্দিনে আনন্দে সঙ্গ দেব তোমাকে, তখন ব্যক্তিসত্তার স্পর্শে মানুষ আত্মিক নির্মাণের পছন্দ আর আকাঙ্ক্ষার সাকার রূপ দেখতে পায়। বিশ্ব জোড়া অতিমারির আবহেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সূক্ষ্ম অনুভূতির এরকম বিস্তার আমরা লক্ষ করেছি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের উদ্ভাসে। সংকল্পে আর তার কোলাহলহীন অবয়ব তৈরিতে। মানুষ মানুষের জন্য, এত দিন যে সহজিয়া বাণী আমাদের প্রাণিত, আমাদের মধ্যে নতুন নতুন দিশামুখ গড়েছে, করোনার সংকটে তার বিস্ময়কর চেহারা দেখতে পেল বিশ্ব। খুশির কথা, এবারের শারদীয় উত্সবে, সর্বকল্যাণের কাঙ্ক্ষিত সামাজিকতায়, বিধিনির্দেশিত ইচ্ছার সরব চেহারা ছড়িয়ে আছে মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে। ক্লাব থেকে ক্লাবে। মৌসুমি গানে। মণ্ডপের স্থাপত্যে। উদ্যোক্তাদের ভেতরের বৈভবের বিকশিত বহিরঙ্গে।
দিন চারেক ধরে, প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়ছি। স্টিয়ারিং হাতে একা। এরকম সফরে অনুভূতির নিত্য সঙ্গীকে এড়িয়ে যাই, তাকে ছাড়াই আনন্দময় জগেক দেখি, উত্সবের সর্বময়তায় আবিষ্কার করি নিজের ক্ষুদ্রতা, আত্মসর্বস্বতা ও ভুল চিন্তাকে। আর এরকম মুহূর্তে আবিষ্কার করার সুযোগ এসে যায় যে, মোহ যাকে স্পর্শ করে না, পরম বেদনায়, তার স্বাভাবিক অঙ্গসজ্জা হয়ে ওঠে রমণীয়, কমনীয় এবং আরো বিস্তারিত। হূদয়ের শুদ্ধতার এরকম বিস্তারই সম্ভবত উত্সবের নিত্য নতুন বিস্ময়। এই বিস্ময়কে একা অনুভব করা যায় হয়তো, কিন্তু এই এককতায় কি প্রকট হয়ে ওঠে না ব্যক্তিস্বার্থ? ব্যক্তিস্বার্থের কুিসত ও কদর্য রূপ আমরা অনেক দেখেছি।
ভবিষ্যতেও দেখব। একে লাগাম পরানো দরকার। কলকাতার বারোয়ারি পুজো প্রায় সব অর্থেই ব্যক্তিক ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করতে চায়। এই অতিক্রমণে বৃহতের যে আয়োজন দেখি, সেই আয়োজনে সমষ্ঠির গান, সমষ্ঠির কবিতা, সমষ্ঠির ভাস্কর্য, সমষ্ঠির মঞ্চায়ন সীমাকে অস্বীকার করে বৃহত্ অথবা সমগ্রের প্রশ্নহীন সঙ্গী হয়ে উঠতে চায়।
বাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে দুর্গোত্সব যে দিন সম্মিলিত অঙ্গনে পা বাড়াল, সেদিন থেকেই তার বহুমুখী যাত্রা শুরু এবং ধর্মীর অনুষ্ঠানিকতার চাইতে বড়ো হয়ে উঠতে থাকল সাংস্কৃতিপ্রেমের বহুমুখরতা। এ কথা এভাবে কেউ ভেবেছেন কি না জানি না। ভাবলে ভালো হয়। এতে কুত্সালিপ্ত চিহ্নের পাশে মহিমার তাত্ত্বিক স্বরূপ ভেসে উঠবে বহুখণ্ডিত আরশিতে। আরশির ভাঙনকে জোড়া দেওয়া যে সম্ভব, এতে সেই ইচ্ছায় অনেকটাই জোর বাড়বে। এ কথা বলতেই গত পাঁচ দিনের অভিজ্ঞতা শোনানোর পরিসর খুঁজছি। এরকম সুযোগ যখন এসেই গেল, বিশেষ করে সুরচিত মুহূর্তে, তা সংক্ষেপে, হূদয় খুলে বলতেই হবে।
শুক্রবার তৃতীয়ার সন্ধ্যা। উদ্বোধনী শুরু হয়নি। প্রস্তুতি জোর কদমে। কেনাকাটার ধুম লেগেছে বাজারে। ফুটপাতে, রাস্তায়, ছোট-বড়ো দোকানে। বড়লোকের ফ্যাশন মলে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই একটি মল এলাকায় হাজির। উপচে পড়ছে তারুণ্য। চমকে চমকে যুবক-যুবতীর প্রাণচাঞ্চল্য হাসি ওড়াচ্ছে। পরনে লাল কামিজ আর সাদা লেগিংসের অপূর্ব বন্ধুত্ব। মন জুড়িয়ে গেল। যুবক-যুবতীরা হাঁটছে। হাসছে। একটি যুবতীর চুল কোমর ছাড়িয়ে পায়ের তালে তালে দুলছে। চোখ খুলে, মন খুলে দেখছি—এরকম ডজন ডজন ছেলেমেয়ে প্রাক উত্সবের মুক্তাঙ্গনে ভাসছে। তুরস্কের নোবেল বিজয়ী লেখক ওরহান পামুকের উদ্দেশে ভাবাবেগ উড়িয়ে দিচ্ছে, মাই নেম ইজ রেড। আমার নাম লাল। পামুক এখন কোথায়? ইস্তাম্বুলে না আলেকজান্দ্রিয়ায়। বাংলার বৃহত্তম উত্সবের মৌসুমে এসে তিনি যদি দেখে যেতেন, এখানকার তারুণ্য, এখানকার চাঞ্চল্য, এখানকার দৃপ্ত ও উদ্দীপ্ত যৌবন অনবরত তাদের পোশাক-আশাকে লাল রঙের সঙ্গী হয়ে তাকেই প্রকারান্তরে অভিবাদন জানাচ্ছে, হয়তো খুশি হতেন। বলার বিষয়, লালের মতো রং হয় না। বাংলা লাল রংকে বরণ করেছিল। বেশিদিন গ্রহণ ও ধারণ করতে পারল না। আপাতত শুধু পোশাকেই তার স্মৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। লালের প্রভাব কি শুধু বাংলায়? ভারতের অন্যত্র, বাংলাদেশেও কি এই রংরূপ ছুঁয়ে থাকার প্রভাব বাড়ছে না? বাড়ছে। আমার বিশ্বাস, লাল রাজনীতির রং নয়। তার শুদ্ধতায় প্রকৃতির সম্মিলিত, সুমিশ্রিত প্রলেপ ছড়িয়ে আছে বলেই সে এত সুন্দর, এত পবিত্র; এত প্রাণচাঞ্চল্য।
কলকাতায় এবারের পুজোর আবেগ একটু বেশি। চাঞ্চল্যও বেশি। কারণ দুই বছরের রুদ্ধ আনন্দ জড়ো হয়ে, এক হয়ে, একাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মহোত্সবে। তৃতীয়ার এই সন্ধ্যায় আমি কখনো কলকাতার দক্ষিণে, কখনো উত্তরে, কখনো মধ্য কলকাতায়। রাত ১০টায় মধ্য কলকাতায় না বলা আমেজ নিয়ে পার্কসার্কাসের সম্প্রীতির পুজো হয়ে, একডালিয়া মহামণ্ডপ হয়ে রাসবিহারি এলাকার মহানির্বাণ রোড, মনোহর পুকুর সেকেন্ড লেন ও অশ্বিনী দত্ত লেনের ত্রিবেণী সঙ্গমে এসে দাঁড়াতেই ঘেরাও করল প্রাকাণ্ড বিস্ময়। পুজোর উদ্যোক্তা বিধায়ক দেবাশীষ কুমার। তাকে খুঁজছি। খানিকটা চেনা মুখ। খুব একটা আলাপ নেই। কম কথার, বেশি কাজের মানুষ। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িই তার ব্যস্ততার প্রতীক। বলা উচিত, আত্মবিমুখ, প্রচারবিমুখ জনপ্রতিনিধি। আড্ডার ছলে আলাপচারিতা শুরু। সাক্ষাত্কার নয় । নিছক কথা বলতে এসেছি। জানতে ইচ্ছে করছে, তাদের এই পুজো কমিটির নাম ‘ত্রিধারা সম্মেলনী’ কেন? নিজেকে আড়াল করে জবাব দিলেন দেবাশীষ। বললেন, ইতিহাস বদলে যায়। আমাদেরও বদলে গেছে। তিনটি রাস্তা একটি মোড়ে এসে জড়ো হয়েছে বলেই সম্ভবত এই নাম। এর চেয়ে বেশি কোনো ব্যাখ্যা নেই, নামের সমর্থনে যুক্তিও নেই। আমি অন্য একটি যুক্তি খুঁজে এলাম, যা ইতিহাস ছোঁওয়া, সংস্কৃতি ছোঁওয়া এবং বারোয়ারি পুজোর সেবামুখর সামাজিকতাকে বাড়িয়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ।
১৯৪৭। দেশভাগ আসন্ন। কলকাতার জনবিন্যাস স্বাভাবিক গতি হারিয়ে স্তম্ভিত। দিশেহারা। গোষ্ঠীনির্ভরতা বাড়ছে। মিশ্র বসবাসের স্বাভাবিক ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে বিভিন্ন জনসত্তা নিরাপত্তাবোধকে বড় করে দেখছে। মনোহরপুকুর রোডের তেরাস্তার এলাকাও ব্যতিক্রম নয়। ঠিক এরকম মুহূর্তেই এখানকার শুভবুদ্ধি ত্রিধারা নাম দিয়ে দেশভাগের প্রাক্কালে কলকাতার মেট্রোপলিটান সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখার বহমান ঐতিহ্যকে তাদের বারোয়ারি উত্সবে জড়িয়ে থাকার স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নটি বাড়তে বাড়তে ত্রিধারার মারফতে আজ সে একটি সর্বময় প্রতিষ্ঠান। কেবল শারদীয় উত্সবে, ধর্মকর্মে সৌভাগ্যবানদের চর্যা ও পরিচর্যায় তার কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় উত্সবকে নির্বিশেষের—বঞ্চিত ও প্রান্তজনের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া যায়—সে মহত্ কর্মেই প্রধানত নিয়োজিত ত্রিধারার স্বপ্নময়তা।
কলকাতাকে মহান করেছে তিনটি সংস্কৃতি। এক. হিন্দু সাধনার শুদ্ধতা ও সম্মুখপ্রবণ মুখচ্ছবি (উনিশ শতকের নবজাগরণ, যার একটি বিবর্তিত ধারা)। দুই. সেমিটিক ইসলামের হাত ধরে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সৌন্দর্যবোধ। তিন. ইউরোপের যুক্তিনির্ভরতা, আধুনিক শিক্ষা ও শিল্প নির্মাণ। বাংলা যেসব সত্ কাজে এগিয়ে থাকে, উপমহাদেশকে সম্মুখে তাকাতে বলে—সংস্কৃতির এই ত্রিশক্তি, আমাদের কলকাতার অগ্রচিন্তার উত্স। এখানে সমন্বয়, সম্প্রীতি, সুবিচার এবং দারিদ্র্য হত্যা, অশিক্ষা হত্যা, অসুখ হত্যার লড়াইয়ের চেহারাটা সত্যের মতোই সত্য। আমরা গর্বিত, বৌদ্ধ-হিন্দুর সহিষ্ণুতা, ভারতীয় ইসলামের মিলনাকাঙ্ক্ষা আর খ্রিষ্টজনের দরিদ্রসেবাকে বুকে জড়িয়ে সারা বছর সংস্কৃতিকর্মে, মানবসাধনায়, বিনা মূল্যে চিকিত্সায়, গরিবসেবায় ত্রিধারা পুজো কমিটি
যেভাবে নিজেকে জড়িয়ে রাখে, যেভাবে আটকে রাখে আত্মাকে, তা একটি ফলিত দর্শনের নিদর্শন। এই দর্শনের সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসতথ্য আমাদের খোঁজা দরকার। সবচেয়ে বড়ো কথা, বাংলার একটি বহুমাত্রিক ক্লাব, বহুপ্রজ পুজো কমিটি তার ৫০ বছরের ইতিহাসে কোন শক্তিবলে, কোন ঐক্যের জোরে প্রতিভার বিকাশ ও স্বীকৃতিকে ধারাবাহিকভাবে এত বেশি প্রাণিত করছে, গর্বের সঙ্গে বলা দরকার তা। এদের কর্ম হোক সবার কর্ম। এদের আদর্শ হোক সবার আদর্শ। এদের প্রাণের ধারা হোক সবার ধারা। উত্সবের মৌসুমে একান্ত প্রার্থনা এটাই।
n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা